ইতিহাস কখনো শুধু ইট-পাথরের কোনো ভবনের গল্প নয়। ইতিহাস হলো ক্ষমতা, পরিচয়, স্মৃতি ও বয়ানের গল্প। ঢাকার শাহবাগের ইশারত মঞ্জিল তার একটি অসাধারণ উদাহরণ।
আজ যে জায়গাটি ‘মধুর ক্যান্টিন’ নামে পরিচিত, একসময় সেটি ছিল ঢাকা নবাব পরিবারের শাহবাগ বাগানবাড়ির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ভবনেই ১৯০৬ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখান থেকেই অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত আসে। অর্থাৎ যে স্থান আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘মধুর ক্যান্টিন’ নামে পরিচিত, তার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়েছিল মুসলিম রাজনৈতিক জাগরণকে কেন্দ্র করে।
কিন্তু এই ইতিহাসের আগে আরও একটি বড় ইতিহাস আছে, বাংলার মুসলমানদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পতনের ইতিহাস।
ইংরেজ আসার আগে বাংলার মুসলিম সমাজের নিজস্ব একটি অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম ছিল।
রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, আদালত-কাচারি ও বিভিন্ন পেশায় মুসলিমদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল। এই শ্রেণির একটি অংশ মাদ্রাসা, মসজিদ, খানকা ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে অর্থ দিত। ফলে সম্পদ শুধু অভিজাতদের হাতে আটকে থাকত না; ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান হয়ে তা সমাজের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র মানুষের কাছেও পৌঁছাত।
অর্থাৎ, রাষ্ট্র → মধ্যবিত্ত → মাদ্রাসা/খানকা → দরিদ্র মুসলিম সমাজ।
এই সামাজিক অর্থনৈতিক কাঠামোই ছিল মুসলিম সমাজের শক্তির অন্যতম ভিত্তি।
ঔপনিবেশিক শাসন সেই কাঠামোকে ভেঙে দেয়।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, ভূমি-রাজস্ব ব্যবস্থা, ওয়াক্ফ ও লাখেরাজ সম্পত্তির ওপর ঔপনিবেশিক হস্তক্ষেপ এবং প্রশাসনিক ভাষার পরিবর্তনের ফলে বাংলার পুরনো মুসলিম অভিজাত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি ভয়াবহ সংকটে পড়ে।
বিশেষ করে প্রশাসন ও শিক্ষায় ইংরেজির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর নতুন শিক্ষিত শ্রেণি দ্রুত সরকারি চাকরি ও প্রশাসনে জায়গা করে নেয়। মুসলিম সমাজ তখন শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়তে থাকে।
এর ফল ছিল ভয়াবহ, ক্ষমতা হারাল মুসলমান, সম্পদ হারাল মুসলমান, চাকরি হারাল মুসলমান; আর ধীরে ধীরে তৈরি হলো নতুন সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস।
অর্থনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে সামাজিক ক্ষমতাও বদলে গেল।
জমিদার, নায়েব, কেরানি, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে যারা উঠে এল, তাদের বড় একটি অংশ ছিল হিন্দুরা।
ফলে অর্থের প্রবাহের একটি বড় অংশ একই সামাজিক নেটওয়ার্কের ভেতরে ঘুরতে থাকল। অন্যদিকে মুসলিম সমাজ ক্রমে গ্রামীণ, দরিদ্র ও প্রান্তিক হয়ে পড়ল।
এটা শুধু অর্থনীতির পরিবর্তন ছিল না; এটা ছিল একটি সমাজের ক্ষমতার কাঠামো বদলে যাওয়ার ইতিহাস।
১৮৫৭-এর পর মুসলিম নেতৃত্ব নতুন বাস্তবতা বুঝতে শুরু করে।
সামরিক প্রতিরোধ দিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে পরাজিত করা সহজ নয়, এই বাস্তবতা মুসলিম নেতৃত্বের একটি বড় অংশ উপলব্ধি করে। তাই মুসলিম সমাজের সামনে তখন দুটি জরুরি কাজ দাঁড়ায়:
শিক্ষায় এগিয়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
একদিকে আলিগড় আন্দোলন মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষার দিকে এগিয়ে নেয়। অন্যদিকে দেওবন্দের আলেমসমাজ ধর্মীয় শিক্ষা ও ঔপনিবেশিক বিরোধী চেতনার নিজস্ব ধারাকে শক্তিশালী করে।
অর্থাৎ মুসলিম সমাজ তখন একসঙ্গে শিক্ষা, ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক অধিকার, তিনটি ক্ষেত্রেই নিজেদের পুনর্গঠনের চেষ্টা করছিল।
এরই মধ্যে বঙ্গভঙ্গ নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করল।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ববঙ্গ(মুসলিমবঙ্গ) ও আসামকে নিয়ে নতুন প্রদেশ গঠিত হয়। পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা এটিকে স্বাগত জানায়, কারণ নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর ফলে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের শিক্ষা, চাকরি ও প্রশাসনে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
অন্যদিকে কলকাতাকেন্দ্রিক প্রভাবশালী হিন্দু শ্রেণির একটি বড় অংশ বঙ্গভঙ্গের তীব্র বিরোধিতা করে। ক্ষুদিরাম, সূর্যসেনের মত জ’ঙ্গিরা বোমাবাজি শুরু করে। ক্ষুদিরাম বড় লাটকে লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালায়। হিন্দুদের জ’ঙ্গি হামলার প্রেক্ষাপটে পূর্ব বঙ্গ প্রদেশের ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে যায়। আর হিন্দু জ’ঙ্গিদের গডফাদার রবি ঠাকুর তো মুসলমানদের বিরুদ্ধে লেগেই ছিল।
আর এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই ঢাকার মুসলিম নেতৃত্ব সর্বভারতীয় মুসলিম রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে।
ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহ মুসলমানদের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য সর্বভারতীয় একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন অনুভব করেন। ১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার শাহবাগে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় মুহাম্মদান এডুকেশনাল কনফারেন্সের পর মুসলিম নেতারা একটি রাজনৈতিক সংগঠন গঠনের সিদ্ধান্ত নেন।
সেই সিদ্ধান্ত থেকেই জন্ম নেয় অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ।
আর এই ঘটনাটিই ঘটেছিল আজকের মধুর ক্যান্টিনের স্থাপত্যিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত সেই ইশারত মঞ্জিলে।
পরবর্তী চার দশকে মুসলিম লীগ ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রধান প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয় এবং শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অথচ আজকের প্রজন্মের কাছে সেই জায়গাটির প্রধান পরিচয় কী?
‘মধুর ক্যান্টিন’।
৭১ এর পরে ক্ষুদিরামদের উত্তরসুরীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো থেকে কোরআনের আয়াত বাদ দেয়। জিন্নাহ হলের নাম বদলিয়ে রাখা হয় সূর্য সেন হল, আল্লামা ইকবাল হলের নাম বদলিয়ে রাখা হয় জহুরুল হক হল, আর ইশারত মঞ্জিলের নাম বদলিয়ে রাখা হয় মুধুর ক্যান্টিন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইশারত মঞ্জিলের ইতিহাস আমরা কতটা মনে রেখেছি?
যে স্থানে মুসলিম রাজনৈতিক জাগরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়েছিল, সেই স্থানের সেই পরিচয় আজ কতজন জানে?
ইতিহাস মুছে ফেলার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি সবসময় কোনো বই পুড়িয়ে ফেলা নয়।
কখনো কখনো শুধু নামটা বদলে দিলেই হয়।
একটি স্থানের নাম বদলে যায়, তারপর প্রজন্ম বদলায়, তারপর স্মৃতি বদলায়, একসময় মানুষ ভুলেই যায়, ওই জায়গায় একদিন কী ঘটেছিল।
তাই মধুর ক্যান্টিনকে শুধু মধুর ক্যান্টিন হিসেবে দেখলে ইতিহাসের একটি বড় অধ্যায় অদৃশ্য থেকে যায়।
ইশারত মঞ্জিলের ইতিহাস বাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিক আত্মপরিচয় ও সংগঠিত হওয়ার ইতিহাস।
ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার করতে হলে ইশারত মঞ্জিলকে মনে রাখতে হবে।
কারণ একটি জাতির ইতিহাস শুধু বিজয়ের গল্প নয়;
কীভাবে তার পরিচয়, ক্ষমতা ও স্মৃতির ওপর দিয়ে সময়ের স্রোত বয়ে গেছে, সেটাও তার ইতিহাস।
