বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ডে চরম অব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পনার কারণে জনভোগান্তি ব্যাপকভাবে বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
রোববার সন্ধ্যায় রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠক শেষে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।
নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, সরকার নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার না করে ১৮০ দিনের একটি ‘সাফল্যের চিত্র’ তুলে ধরার চেষ্টা করছে, যা জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। অতীতে আওয়ামী লীগ যে ধরনের প্রতারণার রাজনীতি করেছে, বিএনপি সরকারও একই পথে হাঁটছে বলে দাবি করেন তিনি।
এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে ১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকসহ শরিক দলগুলোর নেতারা অংশ নেন। বৈঠকে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চসহ চলমান বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা একেবারে তলানিতে পৌঁছেছে। গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অন্তর্বর্তী সরকার বা বিপ্লব-পরবর্তী সময়ের চেয়েও খারাপ হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, দেশে বিদ্যুতের লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। পাশাপাশি জ্বালানি ও গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। গ্যাস ও সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে, অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একদিকে চাঁদাবাজির ভোগান্তি, অন্যদিকে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষ ও শিল্প খাত চরম দুর্ভোগে পড়েছে। একই সঙ্গে সার সংকটের কারণে কৃষকরাও সমস্যায় রয়েছেন।
ব্যর্থতা স্বীকার না করে সাফল্য দেখিয়ে প্রতারণা করছে সরকার
নাহিদ ইসলাম বলেন, ১৮০ দিনের ব্যর্থতার জন্য সরকারের উচিত ছিল জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং বিরোধী দলসহ সবার সহযোগিতা চাওয়া। কিন্তু তা না করে সরকার বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ার মধ্য দিয়েই সরকার এই প্রতারণার রাজনীতি শুরু করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফিরে ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ বলে দেশকে স্থিতিশীল ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ডে বরং অব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পনার চিত্রই ফুটে উঠেছে। মাত্র ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের প্রয়োজন হওয়াও সরকারের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের প্রমাণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, সরকার বিরোধী দলের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে পরিকল্পনা চেয়েছিল। জ্বালানি সংকট নিয়ে গঠিত কমিটিতে বিরোধী দলও প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই কমিটিকে কার্যকর করা হয়নি এবং প্রতিবেদনের বিষয়েও কোনো কার্যকর আলোচনা হয়নি। ফলে সরকারের অব্যবস্থাপনার খেসারত জনগণকে দিতে হচ্ছে।
তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনগণের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারকে কার্যক্রম শুরু করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব পক্ষকে নিয়ে জাতীয় নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতার প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, তিনি আশা করেছিলেন মন্ত্রণালয়টিতে পরিবর্তন আসবে। তার মতে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতোমধ্যে ব্যর্থতার প্রমাণ দিয়েছেন এবং সরকারের উচিত মন্ত্রণালয়টি পুনর্গঠন করা। প্রয়োজনে বিরোধী দল সরকারকে নীতিগতভাবে সহযোগিতা করবে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ-ভারতের নতুন পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের দাবি
সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী নয়। ভারত সফর করা হবে কি না—এ বিষয়েও সরকার জনগণকে স্পষ্ট কোনো বার্তা দিতে পারছে না।
তিনি বলেন, ৫ আগস্ট দিল্লিতে আওয়ামী লীগকে প্রেস ব্রিফিং করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে ভারতকে যথাযথ জবাবদিহির আওতায় আনতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তার দাবি, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে দিল্লিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সব দেশের সঙ্গে মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক চায়। গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া, অন্যান্য নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইনসহ বাংলাদেশ-ভারতের পারস্পরিক সমস্যাগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করে নতুন পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শেখ হাসিনার বিচার ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর জাতির জন্য কল্যাণকর হবে না বলেও ১১ দল মনে করছে বলে জানান নাহিদ ইসলাম।
৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ সফল করার আহ্বান
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, সরকার এক কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ছয় মাসেও উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি। বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষাসহ নানা ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও আবারও সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে এবং নজিরবিহীন দলীয়করণ চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, সরকার জুলাই সনদ, গণভোট এবং নিজেদের ঘোষিত ৩১ দফার কোনোটিই যথাযথভাবে অনুসরণ করছে না। জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিও তারা রক্ষা করছে না। এ পরিস্থিতিতে সংসদের বাইরে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জনগণের কাছে গিয়ে তাদের ঐক্যবদ্ধ করা হচ্ছে। সরকার যদি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করে, তাহলে ১১ দল গণতান্ত্রিকভাবে রাজপথে তার জবাব দেবে।
৫ সেপ্টেম্বরের ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চে সবাইকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এটি একটি গণতান্ত্রিক কর্মসূচি। কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বাধা এলে তা গণতান্ত্রিকভাবে মোকাবিলা করে কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া হবে।
এ সময় ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, লংমার্চের প্রধান দাবি হলো গণভোটের রায় বাস্তবায়ন। পাশাপাশি জুলাই গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সমাধানও তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে।
