ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হচ্ছে আগামীকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায়। অধিবেশনটি স্বল্পমেয়াদি হলেও বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সংসদ উত্তপ্ত হতে পারে।
এ অধিবেশনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন সংসদে উত্থাপন ও পাসের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব বিল নিয়ে বিরোধী দল আপত্তি বা আলোচনা তুলতে পারে। একই সঙ্গে সংসদীয় কমিটিগুলোর গঠনও এই অধিবেশনে সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, অধিবেশন শুরুর আগে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় কার্যউপদেষ্টা কমিটির বৈঠক হবে। স্পিকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে অধিবেশনের মেয়াদ, আলোচ্যসূচি, বিল উত্থাপন, প্রশ্নোত্তর ও অন্যান্য কার্যক্রমের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অধিবেশনটি প্রায় ১১ কার্যদিবস চলতে পারে।
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ গত ১১ আগস্ট সংসদ অধিবেশন আহ্বান করেন। সংবিধান অনুযায়ী, দুটি অধিবেশনের মধ্যবর্তী বিরতি ৬০ দিনের বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। গত ১৫ জুলাই দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হওয়ায় আগামী ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন অধিবেশন শুরু করা বাধ্যতামূলক ছিল। তবে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘের সম্মেলনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাবেন। এ কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই অধিবেশন শুরু হচ্ছে।
যেসব বিল উঠতে পারে
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন ইতোমধ্যে সংসদে উত্থাপনের জন্য জমা হয়েছে।
এ ছাড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত ব্যাংক রেজল্যুশন (সংশোধন) আইন এবং র্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে নতুন বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের জন্য প্রস্তাবিত স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইনও বিল আকারে উত্থাপনের জন্য জমা দেওয়া হতে পারে। এসব বিল এই অধিবেশনেই পাস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংকট নিয়ে সরব হতে পারে বিরোধী দল
বিরোধী দল সূত্র জানিয়েছে, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিষয় তারা সংসদে তুলে ধরবে। এসব বিষয়ে একাধিক মুলতবি প্রস্তাবও দেওয়া হতে পারে।
ঢাকা-১৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান) আগের অধিবেশনে সীমান্ত হত্যা ও অবৈধ পুশইন নিয়ে আলোচনার জন্য নোটিশ দিয়েছিলেন। বিষয়টি আলোচনার জন্য নির্ধারিত হলেও বাজেট অধিবেশনে সময়ের অভাবে তা স্থগিত হয়। এবার বিষয়টি আবারও সংসদে উঠতে পারে।
৩৫ সংসদীয় কমিটি গঠন বাকি
সংসদের কার্যপ্রণালি অনুযায়ী, প্রথম তিনটি অধিবেশনের মধ্যে সব সংসদীয় কমিটি গঠনের কথা। তবে প্রথম দুই অধিবেশনে মাত্র ১৫টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে মোট ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে ৩৯টি মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি এবং ১১টি বিষয়ভিত্তিক কমিটি।
এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত ৯টি এবং বিষয়ভিত্তিক ৬টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফলে বাকি ৩৫টি কমিটি এই অধিবেশনেই গঠনের কথা রয়েছে।
জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, আসনসংখ্যার অনুপাতে বিরোধী দলের ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে ১১টির সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ার কথা। তবে এখন পর্যন্ত গঠিত ১৫টি কমিটির মধ্যে মাত্র একটির সভাপতি পদ বিরোধী দল পেয়েছে। বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে সরকারি হিসাবসম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে।
বিরোধী দল সূত্রের দাবি, গত অধিবেশনে গঠিত সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্য অন্তর্ভুক্তির শর্ত দেওয়া হয়েছিল। বিরোধী দল ওই কমিটি বর্জন করায় অন্যান্য সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদে তাদের সদস্যদের দায়িত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা কমে গেছে।
চিফ হুইপের বক্তব্য
সংসদ অধিবেশনের প্রস্তুতি সম্পর্কে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, অধিবেশন উপলক্ষে সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মধ্যবর্তী সময়ের এই অধিবেশন সংক্ষিপ্ত হলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হতে পারে। বিরোধী দল কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু তুললে তা নিয়ে আলোচনা করা হবে। একই সঙ্গে সংসদীয় কমিটিগুলোর গঠনও সম্পন্ন করা হবে।
এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় বিএনপির সংসদীয় দলের সভা অনুষ্ঠিত হবে।
সংসদ ভবন এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ
তৃতীয় অধিবেশনকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদ ভবন ও আশপাশের এলাকায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ, মিছিল, শোভাযাত্রা ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। একই সঙ্গে ওই এলাকায় অস্ত্র, বিস্ফোরক ও ক্ষতিকর দ্রব্য বহনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
গত সোমবার ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। বুধবার রাত ১২টা থেকে এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন এলাকার মধ্যে রয়েছে মহাখালী ক্রসিং থেকে পুরাতন বিমানবন্দর হয়ে বাংলামোটর ক্রসিং পর্যন্ত এলাকা। এছাড়া বাংলামোটর লিংক রোডের পশ্চিম প্রান্ত থেকে হোটেল সোনারগাঁও রোডের সার্ক ফোয়ারা পর্যন্ত এবং পান্থপথের পূর্ব প্রান্ত থেকে গ্রিন রোডের সংযোগস্থল হয়ে ফার্মগেট পর্যন্ত এলাকা এর আওতায় রয়েছে।
এ ছাড়া শ্যামলী মোড় থেকে ধানমন্ডি-১৬ নম্বর সড়কের সংযোগস্থল, রোকেয়া সরণি থেকে পুরাতন নবম ডিভিশন ক্রসিং হয়ে বিজয় সরণির পর্যটন ক্রসিং এবং ইন্দিরা রোডের পূর্ব প্রান্ত থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত এলাকাতেও নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
জাতীয় সংসদ ভবনের সংরক্ষিত এলাকা এবং নির্ধারিত সীমানার ভেতরের সব রাস্তা ও গলিপথও এ নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত থাকবে।
