দেশজুড়ে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে আবাসিক এলাকায় চুলায় গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। চাপ কম থাকায় সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে গ্রাহকদের। গ্যাসের অভাবে ডায়িং ও নিটিং কারখানাগুলো দিনের বড় একটি সময় উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। ঢাকার বাইরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সেখানে অনেক মানুষকে প্রতিদিন ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হচ্ছে। বর্তমানে দিনে বিদ্যুতের ঘাটতি ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি গ্যাসের ঘাটতি পৌঁছেছে প্রায় ১৬০ কোটি ঘনফুটে।
পেট্রোবাংলা এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ দৈনিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার দেশে গ্যাসের মোট চাহিদা ছিল ৩৮০ থেকে ৪০০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে নিজস্ব উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ২৩৮ থেকে ২৪০ কোটি ঘনফুট। ফলে নিট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৪০ থেকে ১৬০ কোটি ঘনফুট।
এদিন দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র—শেভরন, বিজিএফসিএল ও এসজিএফএল—থেকে সরবরাহ করা হয় ১৬১ কোটি ঘনফুট গ্যাস। অন্যদিকে মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ও স্পট মার্কেট থেকে আমদানি করা এলএনজি পুনঃগ্যাসীকরণের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে যোগ করা হয় আরও ৭৭ থেকে ৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে রাখতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ করা হয় ৯৩ থেকে ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস।
বিদ্যুতের ঘাটতিও তীব্র
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি ও বিদ্যুৎ বিভাগের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, তীব্র গরমের কারণে গতকাল সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল বেশি। দুপুরের দিকে চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি থাকলেও সন্ধ্যায় তা বেড়ে ১৬ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি হয়।
চাহিদার বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। ফলে গতকাল লোডশেডিংয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট।
সিএনজি পাম্পে দীর্ঘ অপেক্ষা
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। গতকাল রাজধানীর কয়েকটি সিএনজি পাম্প ঘুরে দেখা যায়, একজন গ্রাহককে জ্বালানি নিতে দুই থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে একটি গাড়িতে মাত্র ৮০ থেকে ১০০ টাকার সিএনজি দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
মুগদার একটি সিএনজি পাম্পের গ্রাহক ও অটোরিকশাচালক আলী হোসেন বলেন, ‘তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াইয়া ১০০ টাহারও গ্যাস না পাইলে খামু কী। ১২ ঘণ্টা গাড়ি চালাইবার গ্যাস নিতে অন্তত চারবার লাইনে দাঁড়াইতে হয়। গ্যাস কিনতেই দিনে আট ঘণ্টা চইলা যায়।’
রান্নাতেও ভোগান্তি
গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে রাজধানীর বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবনও ব্যাহত হচ্ছে। শান্তিনগরের গৃহিণী ফজিলা আক্তার বলেন, গ্যাসের অভাবে সময়মতো রান্না করা যাচ্ছে না। চুলায় গ্যাস না থাকায় বৈদ্যুতিক চুলায় রান্না করতে হচ্ছে। কিন্তু সারা দিনেও তিন থেকে চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না।
গ্যাসের অভাবে বসে থাকছে বিদ্যুৎকেন্দ্র
বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার বড় একটি অংশ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রনির্ভর। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, এসব কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ না পেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হয় না। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি সামাল দিতে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
কর্মকর্তারা আরও জানান, দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা প্রায় সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু গ্যাসের সংকটের কারণে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৫ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। ফলে প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র কার্যত বসিয়ে রাখতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় গ্যাস সংকট শুধু রান্না ও পরিবহন খাতেই নয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার ওপরও সরাসরি চাপ তৈরি করেছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে জনজীবনের পাশাপাশি উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
