গুম প্রতিরোধের অর্ডিন্যান্স বহাল রাখার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি অভিযোগ করেছেন, অর্ডিন্যান্স বাতিল করে গুমের ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের হাতে দেওয়ার মাধ্যমে সরকার ফের গুমের সুযোগ তৈরি করছে।
রোববার (৩০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে জাতীয় সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা ও স্পিকারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচিতে সংসদ ভবনের সামনে আয়োজিত সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
গোলাম পরওয়ার বলেন, গুমের শিকার সংগ্রামী জনতা, জুলাই যোদ্ধা এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যারা নিখোঁজ হয়েছেন, তাদের স্বার্থেই গুম প্রতিরোধের অর্ডিন্যান্স বহাল রাখা জরুরি।
‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালন জাতীয় কমিটি’র উদ্যোগে বেলা ৩টায় রাজধানীর বাংলামোটরে সমাবেশ শুরু হয়। পরে হাজারো মানুষ পদযাত্রা করে জাতীয় সংসদের দিকে যান। সংসদ ভবনের সামনে সমাবেশ শেষে স্পিকারের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
সমাবেশে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে জনগণ ঘোষণা করেছে—বাংলাদেশে আর গুম ও খুনের আস্তানা তৈরি হতে দেওয়া হবে না। জুলাই সনদে মানবাধিকার রক্ষা ও গুম প্রতিরোধে একটি চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে সেখানে নামমাত্র একটি কমিটি করতে চাইছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, সরকার অতীতের ফ্যাসিবাদী শাসনের মতো গুম-খুনের পথেই যেতে চায়।
কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, বর্তমান সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি বাতিল করেছে। সরকারের আনা বিভিন্ন অধ্যাদেশ নিয়ে সমালোচনা করে তিনি বলেন, এগুলো ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা সরকারের সময়কার ব্যবস্থার চেয়েও খারাপ।
আয়নাঘরে গুমের শিকার ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাশেম আরমান এমপি বলেন, ‘আল্লাহ আমাদের দ্বিতীয় জীবন দিয়েছেন। এ বাংলার মাটিতে আর কারও মানবাধিকার যেন ক্ষুণ্ন না হয় এবং গুমের ঘটনা যেন আর ফিরে না আসে।’ বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে এমন আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যাতে কাউকে গুম করার আগে অপরাধীরা বারবার চিন্তা করতে বাধ্য হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সমাবেশে আরও সংহতি প্রকাশ করেন শহীদ জাবের ইবরাহিমের মা রোকেয়া বেগম এমপি, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. আতিক মুজাহিদ এমপি এবং জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপিসহ অন্যান্য সংসদ সদস্য।
পদযাত্রার আগে বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, ব্রিগেডিয়ার (অব.) হাসিনুর রহমান, সাবেক এমপি মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও মানবকণ্ঠ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম।
সংসদ ভবনের সামনে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম, জামায়াতের ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ড. রেজাউল করিম, বিডিপির জেনারেল সেক্রেটারি নিজামুল হক নাঈম, গুমের শিকার শাহাদাৎ হোসেন টুটুল, অ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন এবং মাওলানা মাহফুজুর রহমান।
স্মারকলিপি দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ব্রিগেডিয়ার (অব.) হাসিনুর রহমান বলেন, তারা প্রত্যাশা নিয়ে স্পিকারের কাছে গিয়েছিলেন এবং স্মারকলিপিতে তাদের দাবিগুলো তুলে ধরেছেন। স্পিকার তাদের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত করেননি এবং বিষয়গুলো বাস্তবায়নে সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান আইনের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্ত্রীও তার স্বামীকে গুম করা হয়েছিল—এমন প্রমাণ দিতে পারবেন না। তারা এ ধরনের আইন চান না। ধৈর্যেরও একটি সীমা রয়েছে উল্লেখ করে আগামী ৫ তারিখের লংমার্চসহ পরবর্তী সব কর্মসূচি সফল করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
জাগপার সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এসে গণভোটের রায়ের সঙ্গে বেইমানি করে যে যাত্রা শুরু করেছে, তারই ধারাবাহিকতায় গুম প্রতিরোধের অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে গুমের বিচারপ্রক্রিয়া আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
সমাবেশ চলাকালে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালন জাতীয় কমিটির একটি প্রতিনিধিদল স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিনের কাছে গুম প্রতিরোধের অধ্যাদেশ বাতিলের প্রতিবাদ জানিয়ে এবং আগের অর্ডিন্যান্স বহাল রাখার দাবিতে স্মারকলিপি দেয়। কর্মসূচিতে ১১ দলীয় ঐক্য সংহতি প্রকাশ করে।







