পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ২৯ আগস্ট ইসলামাবাদের কাছে অবস্থিত দেশটির বৃহত্তম অস্ত্র কারখানা (ওয়াহ সেনানিবাসের পাকিস্তান অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিজ বা পিওএফ) পরিদর্শন করেছেন। এই পরিদর্শনের পরই সীমান্ত এলাকায় বিপুল সংখ্যক ভারী কামান মোতায়েন এবং বিভিন্ন দেশের সাথে একের পর এক নতুন সামরিক চুক্তির খবর প্রকাশ্যে আসায় গোটা অঞ্চলজুড়ে তৈরি হয়েছে নতুন সমীকরণ।
সেনাবাহিনীর জনসংযোগ শাখা (আইএসপিআর) জানায়, দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা ও অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা পর্যালোচনার উদ্দেশ্যেই সেনাপ্রধানের এই সফর। পরিদর্শনের সময় ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির বিভিন্ন অস্ত্রের নকশা, উৎপাদন সক্ষমতা এবং গোলাবারুদের পরীক্ষা কার্যক্রম সরজমিনে ঘুরে দেখেন। চলতি বছরের শেষ দিকে আরও দুটি নতুন কেন্দ্র থেকে সামরিক উৎপাদন শুরুর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক এই সামরিক প্রস্তুতি ঘিরে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে নানান প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। পূজার উৎসব ঘনিয়ে আসার মুখে ইসলামাবাদ নতুন কোনো সামরিক অভিযানের ছক কষছে কি না, সে বিষয়ে দিল্লির গোয়েন্দারা নজর রাখছেন। তবে পাকিস্তান খুব শিগগিরই ভারতের বিরুদ্ধে কোনো অভিযানে নামছে—এমন নিশ্চিত তথ্য এখনও পাওয়া যায়নি। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সেনাপ্রধানের সরাসরি কারখানা পরিদর্শনকে কেবল নিয়মিত শিল্প পর্যালোচনা না ভেবে এর গভীর কৌশলগত দিকটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান তাদের সামরিক খাতে চীন ও তুরস্কের সাথে সহযোগিতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করেছে। গত ২৭ আগস্ট কুয়েতের সাথে পাকিস্তানের ‘যৌথ প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। পাশাপাশি সৌদি আরবের সঙ্গেও ইসলামাবাদের প্রতিরক্ষা বন্ধন সুদৃঢ় হয়েছে। চীন মূলত পাকিস্তানের প্রধান সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশ, যাদের প্রযুক্তি পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও স্থলভিত্তিক অস্ত্রের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে।
এ ছাড়া পাকিস্তানের বিভিন্ন বিমানঘাঁটিতে চীন ও তুরস্কের সামরিক পরিবহন বিমানের অস্বাভাবিক যাতায়াত নিয়েও তৈরি হয়েছে জোর আলোচনা। সীমান্তে চীনের তৈরি ‘এসএইচ-১৫ ১৫৫ মিলিমিটার’ স্বচালিত হাউইটজার কামান মোতায়েনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যা পাকিস্তানের শক্তি প্রদর্শনেরই ইঙ্গিত দেয়। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই প্রস্তুতির একমাত্র লক্ষ্য ভারত নাও হতে পারে; কারণ আফগানিস্তান সীমান্ত পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরে বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়ার নিরাপত্তা সংকট সামাল দিতেও হিমশিম খাচ্ছে পাকিস্তান।
উল্লেখ্য, গত বছরের পহেলগাঁও হামলার পর ভারত ‘অপারেশন সিঁদুর’ চালিয়ে পাকিস্তান ও কাশ্মীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানলে দুই দেশের মাঝে বড় ধরনের সংঘাত তৈরি হয়। পরবর্তীতে যুদ্ধবিরতি হলেও ভারতের স্পষ্ট বার্তা ছিল—ভবিষ্যতে কোনো সন্ত্রাসী হামলা হলে তার জবাবে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, ঋণের চাপ ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝে পাকিস্তানের এই নতুন সামরিক তৎপরতা দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর দুই প্রতিবেশীর ওপর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজর পুনরায় জোরদার করেছে।
