ঐতিহাসিক ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ এবং এই জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ এবং তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। জোটটির সূচনা এবং এতে ঢাকার অংশগ্রহণের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল ও প্রক্সি গ্রুপের আসল রূপ প্রকাশ পেতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
চুক্তিটির প্রভাব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে মার্কিন প্রভাব এক অনিবার্য বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন নিজেদের অবস্থান পুনর্বিন্যাস করছে, তেমনি এই জোটে অন্তর্ভুক্ত তিন সদস্য রাষ্ট্র—তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবেরও নিজস্ব স্বতন্ত্র কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের জটিল সমীকরণের মাঝে এই আঞ্চলিক জোটকে কেবল একটি একক শক্তির নিয়ন্ত্রণাধীন মনে করা যুক্তিসঙ্গত নয়।
তবে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের সম্ভাবনা তৈরি হতেই দেশের রাজনীতিতে অভ্যন্তরীণ বিরোধিতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চুক্তিটি যেন আলোর মুখ না দেখে এবং বাংলাদেশ যেন এই জোটে যুক্ত হতে না পারে, সে লক্ষ্যে রাজপথে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৎপর হয়ে উঠেছে একাধিক গোষ্ঠী। চুক্তিবিরোধী এই অবস্থানের কারণে বিভিন্ন আদর্শের দল ও প্রক্সি চক্রগুলো একই সুতোয় গেঁথে গেছে বলে সমালোচনা করা হচ্ছে।
চুক্তিবিরোধী তৎপরতায় মূলত তিনটি নির্দিষ্ট পক্ষকে সোচ্চার হতে দেখা যাচ্ছে—প্রথমত, পশতুন জাতীয়তাবাদী তথা চরমপন্থী ভাবধারার সমর্থক গোষ্ঠী; দ্বিতীয়ত, প্রথাগত বামপন্থী ও কথিত লাল সন্ত্রাসী দলগুলো; এবং তৃতীয়ত, তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে রাজনীতি করা আওয়ামী লীগ, কিছু ধর্মীয় ও বিএনপি-পন্থী একাংশের প্রক্সি চক্র। সম্প্রতি বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ‘ছাত্র ইউনিয়ন’-এর কর্মীদের হাতে আগুন নিয়ে প্রতীকী প্রতিবাদের ঘটনাকে এই চুক্তিবিরোধী প্রোপাগান্ডারই অংশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রখ্যাত অ্যাক্টিভিস্ট ও বিশ্লেষক পিনাকী ভট্টাচার্যের ভূমিকা নিয়েও জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। মক্কা চুক্তির বিরুদ্ধে কৌশলগত বক্তব্য প্রদান এবং একে কেবল মার্কিন বা হামাস-বিরোধী জোট হিসেবে আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশকে দূরে রাখার পরামর্শ দেওয়ায় অনেকেই তাঁকে ‘ভারতের সুপ্ত এজেন্ট’ বলে অভিযুক্ত করছেন। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাহ্যিকভাবে ভারতবিরোধী বক্তব্য দিলেও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে বাংলাদেশের জাতীয় ও কৌশলগত স্বার্থের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করাই এই চক্রের মূল উদ্দেশ্য।
