দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, দায়িত্ব পালনে অসদাচরণ, পলায়ন এবং দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পুলিশের সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত এবং একজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাবেক যুগ্ম কমিশনার, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক উপকমিশনার এবং রংপুরের সাবেক পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা রয়েছেন।
বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-১ ও ২ শাখা থেকে পৃথক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এসব সিদ্ধান্ত জানানো হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত বা অব্যাহতির সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে।
যেসব কর্মকর্তা চাকরি হারিয়েছেন
চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন—ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সঞ্চিত কুমার রায়, সাবেক উপপুলিশ কমিশনার মানস কুমার পোদ্দার, রংপুরের সাবেক পুলিশ সুপার মো. শাহজাহান, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি (সারদা)-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হাফিজ আল ফারুক, পুলিশ স্টাফ কলেজের সাবেক সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হাবিবুল্লাহ দালাল এবং বরিশাল মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার রাশেদুল ইসলাম।
অন্যদিকে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় রাজশাহী মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) মোহাম্মদ রোকনুজ্জামানকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। এরপর তদন্ত পরিচালনা করা হয়।
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) পরামর্শ এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সঞ্চিত কুমার রায় ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। মানস কুমার পোদ্দার ১৮ অক্টোবর ২০২৪ থেকে, মো. শাহজাহান ৯ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে এবং হাফিজ আল ফারুক ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া হাবিবুল্লাহ দালাল ও রাশেদুল ইসলাম ২০২৫ সালের ৯ মার্চ থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুমতি ছাড়া দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও পলায়নের অভিযোগও আনা হয়। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালার সংশ্লিষ্ট ধারায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ
দুর্নীতির অভিযোগে অব্যাহতি পাওয়া রাজশাহী মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ রোকনুজ্জামানের বিরুদ্ধে উপপরিদর্শক (এসআই) পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে মো. কামরুজ্জামানের কাছ থেকে ১৭ লাখ টাকা দাবি করার অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগ অনুযায়ী, কামরুজ্জামান তাকে ৫ লাখ ৫২ হাজার ১৬৩ টাকা দেন। পরে চাকরি না হওয়ায় তিনি ওই টাকা ফেরত চান। টাকা ফেরত না পেয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন।
এরপর অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে রোকনুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, দায়িত্বে অবহেলা এবং দুর্নীতির অভিযোগে বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে নেওয়া এসব সিদ্ধান্ত সরকারি চাকরিতে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নজির।
