বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে নিজস্ব স্বার্থ, ভূরাজনীতি, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শী নেতৃত্ব প্রয়োজন।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষায় জিয়াউর রহমানের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বলে মনে করেন অনেকে। তার শাসনামলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতার ভিত্তিতে আলোচনা এবং গঙ্গার পানির ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ফারাক্কা ইস্যুতে গ্যারান্টি ও আরবিট্রেশন ক্লজ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টিও এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ।
গ্যারান্টি ক্লজের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে বাংলাদেশ কতটুকু পানি পাবে, তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা ছিল। আর আরবিট্রেশন ক্লজের উদ্দেশ্য ছিল কোনো পক্ষ চুক্তি লঙ্ঘন করলে আন্তর্জাতিক ফোরাম বা তৃতীয় পক্ষের সহায়তা নেওয়ার সুযোগ রাখা।
জিয়াউর রহমান আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বহুপক্ষীয় কূটনীতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে সার্ক প্রতিষ্ঠার চিন্তার পেছনে তার ভূমিকার কথা উল্লেখ করে লেখক বলেন, ছোট দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে এককভাবে ভারতের সঙ্গে মোকাবিলা করা কঠিন। তাই প্রতিবেশী ও বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বহুপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করাই ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাণিজ্য ও পানি নিয়ে অসাম্য
লেখকের মতে, ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য বাংলাদেশে এলেও বাংলাদেশের পণ্য ভারতের বাজারে তুলনামূলকভাবে কম প্রবেশের সুযোগ পায়।
পানি বণ্টনের বিষয়টিকেও তিনি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার দাবি, উজানে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্যসম্পদ, পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে তিস্তা অববাহিকা ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার সংকটকে তিনি এ সমস্যার দৃশ্যমান উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
লেখকের অভিযোগ, অভিন্ন নদীগুলোর পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। এর ফলে নদী, কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও সামগ্রিক পরিবেশগত ভারসাম্য হুমকির মুখে পড়ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
ফারাক্কা ও জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ
ভারতের সঙ্গে পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে মওলানা ভাসানী, ফারাক্কা কমিটি এবং বিভিন্ন নাগরিক ও বুদ্ধিজীবী মহলের আন্দোলনের কথাও লেখায় উঠে এসেছে। একই সঙ্গে জিয়াউর রহমানের উদ্যোগকে এ ধারাবাহিকতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
লেখকের দাবি, পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিনের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে এবং দেশের স্বার্থ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
আওয়ামী লীগ, ভারত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
লেখায় আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার শাসনামল নিয়ে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। লেখকের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অভ্যন্তরীণ কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং ভারতের প্রভাব—দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
তিনি ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনকে এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। লেখকের দাবি, ওই নির্বাচনে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় আনার ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকা ছিল। এ বিষয়ে তিনি প্রণব মুখার্জির The Coalition Years বইয়ের বক্তব্যের প্রসঙ্গও টেনেছেন।
তবে এসব রাজনৈতিক অভিযোগ ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার অনেকগুলোই লেখকের নিজস্ব বিশ্লেষণ ও দাবি—যেগুলোর স্বতন্ত্র যাচাই প্রয়োজন।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও রাষ্ট্র সংস্কার
লেখকের মতে, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহ। তার দাবি, এই আন্দোলনের মাধ্যমে দেশে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও রাষ্ট্র সংস্কারের একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল।
কিন্তু তিনি মনে করেন, গণঅভ্যুত্থানের পরও রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর অনেক কিছুই আগের মতো রয়ে গেছে। আমলাতন্ত্র, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও দুর্নীতির কাঠামোগত সমস্যাগুলোর যথেষ্ট পরিবর্তন হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তার মতে, কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য বা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, আইন, প্রশাসনিক সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক আচরণে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হবে।
নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আহ্বান
নির্বাচিত সরকারের প্রতি দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন লেখক। তার মতে, জনগণ জুলাইয়ের আন্দোলনের চেতনার বাস্তবায়ন এবং গণরায়ের প্রতিফলন দেখতে চায়।
তিনি মনে করেন, বাংলাদেশকে পুনরায় কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিবাদী রাজনীতির দিকে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো একক রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের জনগণের নিজস্ব শক্তি ও ঐক্যের ফল। তাই এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
লেখক: ড. হাসানুজ্জামান চৌধুরী, প্রফেসর (অব.), রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।







