পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল, আটা ও বিস্কুট উৎপাদনে ব্যবহৃত ভিটামিন ও মিনারেল আমদানিতে কর, ভ্যাট ও অন্যান্য শুল্ক মওকুফ বা বিশেষ রেয়াত সুবিধা চেয়েছে রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর শাকরুল আলম সীমান্ত এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করেছেন।
মীর শাকরুল আলম সীমান্ত স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ছেলে। প্রতিষ্ঠানটি মীর শাহে আলমের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ভিজিটিং কার্ড সংযুক্ত করে রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলসের পক্ষ থেকে কর মওকুফ বা বিশেষ রেয়াত চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি এনবিআর।
রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলসের চিঠিতে বলা হয়েছে, বগুড়ার শিবগঞ্জের বেতগাড়ী মীরবাড়ীতে প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ফোর্টিফাইড রাইস কার্নেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ২০২৩ সাল থেকে তারা খাদ্য অধিদপ্তরকে রাইস কার্নেল সরবরাহ করে আসছে। এ পর্যন্ত সরকারি খাদ্যবান্ধব ও ভিজিডি কর্মসূচিতে প্রায় ১ হাজার ১৯৮ টন কার্নেল সরবরাহ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি বেসরকারি খাতে প্রায় ২০ টন কার্নেল এবং ২ হাজার টন পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল সরবরাহের কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সাধারণ চালের সঙ্গে ১০০ অনুপাত ১ হারে কার্নেল মিশিয়ে পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল উৎপাদন করা হয়। এই কার্নেল তৈরিতে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-বি১, ভিটামিন-বি১২, ফলিক অ্যাসিড, আয়রন, জিঙ্ক, ম্যাগনেশিয়াম ও ক্যালসিয়াম কার্বোনেটসহ বিভিন্ন উপাদান প্রয়োজন হয়।
ফোর্টিফাইড আটা ও ফোর্টিফাইড বিস্কুট উৎপাদনেও এসব ভিটামিন ও মিনারেল ব্যবহৃত হয় বলে প্রতিষ্ঠানটির চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
রূপসী রাইস মিলসের দাবি, এসব কাঁচামাল বর্তমানে বাংলাদেশে উৎপাদিত হয় না। ফলে দেশের ১৪টি কার্নেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে ভিটামিন ও মিনারেল প্রিমিক্স বা মিশ্রণ হিসেবে আমদানি করে।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, আলাদাভাবে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেল আমদানি না করে প্রিমিক্স আমদানি করায় খরচ বেশি হচ্ছে। এ কারণে প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আমদানির পেছনে ব্যয় হচ্ছে।
রূপসী রাইস মিলস জানিয়েছে, ভবিষ্যতে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যের চাহিদা বাড়লে এই আমদানি ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, তারা দেশে একটি প্রিমিক্স উৎপাদন কারখানা স্থাপন করেছে। তাদের দাবি, বর্তমানে দেশে তারাই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যারা এ ধরনের প্রিমিক্স উৎপাদনের জন্য কারখানা স্থাপন করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেল আলাদাভাবে কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করে দেশে প্রিমিক্স তৈরি করা হবে।
রূপসী রাইস মিলসের দাবি, এভাবে উৎপাদন করা সম্ভব হলে আমদানি খরচ প্রায় ৫০ শতাংশ কমানো যাবে। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য কার্নেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও তুলনামূলক কম দামে তাদের কাছ থেকে প্রিমিক্স কিনতে পারবে।
এর ফলে রাইস কার্নেল উৎপাদনের খরচ কমার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে বলে প্রতিষ্ঠানটি মনে করছে।
কোম্পানিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কাঁচামাল আমদানিতে ভ্যাট, কর ও অন্যান্য শুল্ক মওকুফ অথবা বিশেষ রেয়াত সুবিধা দেওয়া হলে দেশে নতুন শিল্প গড়ে উঠবে।
একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির আরও দাবি, প্রিমিক্সের দাম কমানো সম্ভব হলে পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল, ফোর্টিফাইড আটা ও ফোর্টিফাইড বিস্কুটের উৎপাদন খরচও কমবে। এতে এসব পণ্য সাধারণ মানুষের পাশাপাশি নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর কাছে আরও সহজলভ্য হতে পারে।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আপত্তি জানিয়েছেন।
তার মতে, ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি পরিচয় বা পদ ব্যবহার করা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি এটিকে স্বার্থের দ্বন্দ্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয় হিসেবেও দেখছেন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তিদের এমন আচরণ থেকে বিরত থাকা উচিত। একই সঙ্গে এনবিআরের মতো প্রতিষ্ঠানের উচিত কোনো ধরনের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করা।
এ বিষয়ে রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর শাকরুল আলম সীমান্তের বক্তব্য জানতে ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। সমকালের পরিচয় দিয়ে তার মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
এনবিআরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আলাদাভাবে শুল্ক ও কর ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। এ ধরনের সুবিধা দেওয়া হলে তা সংশ্লিষ্ট খাতের সব প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য হতে হবে।
তবে ওই কর্মকর্তা জানান, কোনো বিশেষ পণ্য যদি দেশে কেবল একটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন করে, সে ক্ষেত্রে সীমিত সময়ের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
এ বিষয়ে এনবিআরের সাবেক সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিনও একক প্রতিষ্ঠানকে এমন সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
তার বক্তব্য, সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদের আলোকে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সুযোগ নেই।
তবে কোনো কর বা শুল্ক ছাড় যদি নির্দিষ্ট একটি খাতের সব প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রযোজ্য হয়, তাহলে সে ধরনের সুবিধা দেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ফরিদ উদ্দিনের ভাষ্য, এনবিআর কোনো একক প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের ছাড় দেওয়ার বিষয়ে মতামত দিলেও আইন অনুযায়ী অর্থ মন্ত্রণালয় বা আইন মন্ত্রণালয়ের পক্ষেও তা অনুমোদন করা সম্ভব নয়।
এদিকে রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলসের আবেদনের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি এনবিআর। ফলে প্রতিষ্ঠানটি চাওয়া কর, ভ্যাট ও শুল্ক সুবিধা পাবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
বিষয়টি একদিকে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উৎপাদনের কাঁচামালের আমদানি ব্যয় কমানোর দাবি, অন্যদিকে একটি প্রতিমন্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিশেষ সুবিধা চাওয়ার কারণে নৈতিকতা ও স্বার্থের দ্বন্দ্বের প্রশ্নও সামনে এনেছে।
