সময়ের সাহসী সন্তান, বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, লেখক, তাত্ত্বিক, গবেষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, ইতিহাসবিদ বদরুদ্দীন উমর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু রয়ে গেছে তার কথা মালা। তিনি ২০২৫ সালের ৭ সেপেটেম্বর সকালে ঢাকার একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। তার বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর।
বদরুদ্দীন উমর ১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর ভারতের বর্ধমানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরে উমর যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিপিই(ফিলোসফি, পলিটিক্স এন্ড ইকোনমিক্স) ডিগ্রি নেন।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে বদরুদ্দীন উমরের কণ্ঠ ছিল বরাবরই বলিষ্ঠ। তিনি গবেষণা, চিন্তা ও লেখায় আজীবন সক্রিয় ছিলেন।
গত ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় তার দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। এতে তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস ও পূর্বাপর ঘটনাবলীর গুরুত্বপূর্ণ দিকসমূহ তুলে ধরেন। আলোচিত সাক্ষাতকারটি আবার প্রকাশ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের লিখিত ইতিহাসের প্রায় ৯০ ভাগই মিথ্যা এবং তা কেবল সরকারি ভাষ্য বলে মন্তব্য করেছেন বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, লেখক ও ইতিহাসবিদ বদরুদ্দীন উমর। দেশের স্বাধীনতার ৫৩তম বিজয় দিবসের প্রাক্কালে বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি ও প্রকৃত সত্য আড়াল করে এতদিন এটিকে এক পরিবারের সম্পত্তি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে, যা এখন পরিষ্কার করার সময় এসেছে।
সাক্ষাৎকারে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ৯৩ বছর বয়সী এই বুদ্ধিজীবী বলেন, ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তান সরকারের সাথে ক্ষমতা হস্তান্তরের আলোচনা ব্যর্থ হওয়া এবং ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর আকস্মিক হামলার কারণেই কোনো পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া এ দেশের মানুষ অসম যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তাঁর মতে, তৎকালীন সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশ চাননি, বরং তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে সর্বোচ্চ আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন।
বদরুদ্দীন উমর দাবি করেন, ১৯৭১ সালে শেখ মুজিব আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানের জেলে চলে যান এবং সেখানে যুদ্ধের নয় মাস তিনি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিলেন। ফলে মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা করা তো দূরের কথা, দেশ স্বাধীন হওয়ার সংবাদও তিনি জানতে পেরেছেন লন্ডনে যাওয়ার পর। শেখ মুজিব স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরেও তাজউদ্দীন আহমদসহ অন্য নেতাদের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ঘটনা শুনতে চাননি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
৭ মার্চের ভাষণ প্রসঙ্গে এই গবেষক বলেন, তৎকালীন উদ্ভূত পরিস্থিতি ও ছাত্র-জনতার চরম চাপের মুখে উত্তেজনার বশে শেখ মুজিব ওই বক্তৃতা দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই ভাষণের পর ১৫ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত তারা কীভাবে পাকিস্তান সরকারের সাথে ক্ষমতার ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনা চালিয়েছিলেন, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের কোনো যুদ্ধের প্রস্তুতি বা গেরিলা লড়াইয়ের পরিকল্পনা ছিল না বলেই ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হামলার মুখে পুরো দলীয় কাঠামো ভেঙে পড়েছিল এবং নেতারা প্রাণভয়ে ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলেন।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে মূল অবদান ছিল এ দেশের সাধারণ মানুষ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সামরিক বাহিনীর সদস্যদের, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ করেছেন। তবে আওয়ামী নেতারা ভারতে আশ্রয় নেওয়ায় পুরো যুদ্ধটি ভারত নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। ১৬ ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণের দলিলে জেনারেল অরোরার উপস্থিতি এবং বাংলাদেশের কোনো উপযুক্ত প্রতিনিধি না থাকাকে তিনি মূলত ভারতের কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ হিসেবে অভিহিত করেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে শেখ মুজিবের শাসনকালের তীব্র সমালোচনা করে বদরুদ্দীন উমর বলেন, জনগণের ব্যাপক সমর্থন থাকা সত্ত্বেও তিনি দেশ পুনর্গঠন না করে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। সেনাবাহিনীকে অবিশ্বাস করে রক্ষীবাহিনী গঠন, জাসদ নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং সব দল ও সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করে বাকশাল কায়েমের মাধ্যমে তিনি চরম জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। পরবর্তীতে প্রকৃতির নিয়মে তাঁর পতন ঘটে।
সবশেষে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এটি ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে যুগান্তকারী ও ব্যাপক গণঅভ্যুত্থান। সাড়ে পনেরো বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসান ঘটিয়ে এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমেই দেশের মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতা উপভোগ করছে এবং ক্ষমতার শূন্যতা ঐতিহাসিকভাবেই পূরণ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
