জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উত্তরসূরি হতে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আটজন প্রার্থী। এখন পর্যন্ত গোপন ভোটের ফলাফলে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন গায়ানার ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বির্কেট।
জাতিসংঘের মহাসচিবের মেয়াদ সাধারণত পাঁচ বছর। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, একজন মহাসচিব পরপর দ্বিতীয় মেয়াদেও দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়ে থাকেন। গুতেরেসের উত্তরসূরি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে।
লাতিন আমেরিকার প্রার্থীদের সম্ভাবনা
অনানুষ্ঠানিক ভৌগোলিক ভারসাম্যের রীতি অনুযায়ী, এবার লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই অঞ্চল থেকে সর্বশেষ মহাসচিব ছিলেন পেরুর হাভিয়ের পেরেজ দে কুয়েলার, যিনি ১৯৯২ সালে দায়িত্ব ছাড়েন।
একই সঙ্গে জাতিসংঘের ৮০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারীকে মহাসচিব করার দাবিও জোরালো হয়েছে। এবারের তালিকায় লাতিন আমেরিকার একাধিক নারী প্রার্থী থাকায় সেই সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে।
এগিয়ে ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বির্কেট
গায়ানার জাতিসংঘ দূত ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বির্কেট বর্তমানে প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী। এর আগে তিনি গায়ানার পররাষ্ট্র ও আদিবাসীবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তিনি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গায়ানার প্রতিনিধিত্ব করেন।
ক্যারিবীয় দেশগুলোর জোট ক্যারিকম আনুষ্ঠানিকভাবে তার প্রার্থিতাকে সমর্থন করেছে। ছোট রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষায় নিজেকে নীতিনিষ্ঠ ও বাস্তববাদী প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরছেন তিনি।
আগস্টে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় দফার অনানুষ্ঠানিক ‘স্ট্র পোল’-এ রদ্রিগেস-বির্কেট আটটি ‘এনকারেজ’, তিনটি ‘ডিসকারেজ’ এবং চারটি ‘নো ওপিনিয়ন’ ভোট পেয়েছেন।
রেবেকা গ্রিনস্প্যানও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী
কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান প্রথম দফার গোপন ভোটে সবচেয়ে ভালো ফল করেছিলেন। জুলাইয়ের ভোটে তিনি ১০টি ‘এনকারেজ’ এবং মাত্র একটি ‘ডিসকারেজ’ ভোট পান। তবে আগস্টের দ্বিতীয় দফায় তার সমর্থন কিছুটা কমে সাতটি ‘এনকারেজ’ ও চারটি ‘ডিসকারেজ’ ভোটে নেমে আসে।
গ্রিনস্প্যান জাতিসংঘের মহাসচিবের কার্যালয় পুনর্গঠন, সংস্থার মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা জোরদার এবং বিভিন্ন বিভাগের কাজের পুনরাবৃত্তি কমানোর পক্ষে। দরিদ্র দেশগুলোর ঋণের চাপ কমানোও তার অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।
রাফায়েল গ্রোসি: কূটনীতির অভিজ্ঞ মুখ
আর্জেন্টিনার রাফায়েল মারিয়ানো গ্রোসি বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক। চার দশকের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন গ্রোসি নিজেকে স্বাধীন ও কোনো নির্দিষ্ট শক্তিশালী দেশের ওপর নির্ভরশীল নন—এমন প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরছেন।
শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন, মানবাধিকার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং বাস্তববাদী বহুপক্ষীয় কূটনীতিকে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন। আগস্টের স্ট্র পোলে তিনি সাতটি ‘এনকারেজ’ ও ছয়টি ‘ডিসকারেজ’ ভোট পেয়েছেন।
নারী প্রার্থীদের মধ্যে এসপিনোসা ও ব্যাশেলে
ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা ২০১৮-১৯ মেয়াদে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সম্ভাব্য সংকট আগে শনাক্ত করতে ‘প্রিভেনশন অ্যান্ড আর্লি অ্যাকশন হাব’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তি নিয়েও আন্তর্জাতিক নীতিমালা তৈরির পক্ষে তিনি।
তবে আগস্টের ভোটে এসপিনোসা চারটি ‘এনকারেজ’ ভোট পেয়েছেন।
চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাশেলেও প্রার্থীদের মধ্যে আলোচিত নাম। দুই মেয়াদে চিলির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ব্যাশেলে ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ছিলেন।
জাতিসংঘের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে সংস্থাটিকে আরও কার্যকর করার কথা বলেছেন তিনি। তবে আগস্টের স্ট্র পোলে তার ‘এনকারেজ’ ভোট মাত্র দুইটি এবং ‘ডিসকারেজ’ ভোট ছয়টি।
আফ্রিকার প্রার্থীরাও রয়েছেন
প্রতিযোগিতায় রয়েছেন সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল। ২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রেসিডেন্ট থাকা সাল জাতিসংঘে আফ্রিকার স্বার্থ আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
উগান্ডার অভিজ্ঞ কূটনীতিক ওলার ওতুনুও প্রার্থী হয়েছেন। তিনি জাতিসংঘে উগান্ডার রাষ্ট্রদূত ও দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে শিশু ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
এ ছাড়া ইকুয়েডরের ইভন এ-বাকিও প্রতিযোগিতায় রয়েছেন। তাকে মনোনয়ন দিয়েছে টোঙ্গা। তবে আগস্টের স্ট্র পোলে তিনি কোনো ‘এনকারেজ’ ভোট পাননি। তার বিপরীতে আটটি ‘ডিসকারেজ’ ভোট পড়েছে।
নির্বাচন হবে কীভাবে?
জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীকে সুপারিশ করবে। এরপর ১৯৩ সদস্যের সাধারণ পরিষদ সেই প্রার্থীকে অনুমোদন দেবে।
তবে বাস্তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় নিরাপত্তা পরিষদে। একজন প্রার্থীকে অন্তত নয়টি দেশের সমর্থন পেতে হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীনের কোনো দেশ যেন প্রার্থীকে ভেটো না দেয়।
প্রার্থীদের অবস্থান বোঝার জন্য নিরাপত্তা পরিষদ অনানুষ্ঠানিক ও গোপন ভোট নেয়, যাকে ‘স্ট্র পোল’ বলা হয়। এতে ‘এনকারেজ’ ইতিবাচক সমর্থন, ‘ডিসকারেজ’ নেতিবাচক অবস্থান এবং ‘নো ওপিনিয়ন’ সিদ্ধান্তহীনতা বোঝায়।
শেষ পর্যন্ত কে হচ্ছেন মহাসচিব?
দ্বিতীয় দফার স্ট্র পোলে সবচেয়ে ভালো ফল করায় বর্তমানে গায়ানার ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বির্কেটকে এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচনে শেষ মুহূর্তের কূটনৈতিক সমঝোতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো প্রার্থীকে শুধু সাধারণ সমর্থন পেলেই হবে না; নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটোও এড়াতে হবে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থীদের নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নতুন মহাসচিব আগামী ১ জানুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তাই শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের ‘পৃথিবীর সবচেয়ে অসম্ভব চাকরি’ কার হাতে যাচ্ছে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে নির্বাচনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পর্যন্ত।
