রাজধানীর কাঁচাবাজারে সবজির সরবরাহ বাড়ায় সপ্তাহের ব্যবধানে দামে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও অন্যান্য নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা কাটেনি। মাছ, মুরগি ও ডিমের দাম এখনো চড়া। এর সঙ্গে গত এক মাসে আটা-ময়দার দামও বেড়েছে। ফলে আয় ও ব্যয়ের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজার, খিলক্ষেত ও মগবাজার কাঁচাবাজার ঘুরে এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে খোলা আটার দাম কেজিতে ৩ টাকা এবং খোলা ও মোড়কজাত ময়দার দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়েছে।
তবে খুচরা বাজারে দাম বৃদ্ধির হার আরও বেশি। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি খোলা আটা প্রায় ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগে এর দাম ছিল প্রায় ৪৫ টাকা। খোলা ময়দার কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকায়, যা এক মাস আগে ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা।
বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মোড়কজাত ময়দার দামও বেড়েছে। বর্তমানে দুই কেজির প্যাকেট ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ কেজিপ্রতি দাম পড়ছে ৮০ থেকে ৮৫ টাকা। এক মাস আগে কেজিপ্রতি দাম ছিল প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ টাকা।
কারওয়ান বাজারের এক মুদি দোকানি জানান, আগে ৫০ কেজির এক বস্তা ময়দা ২ হাজার ৫০০ টাকায় কিনলেও বর্তমানে তা কিনতে হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৮০০ টাকায়। পাইকারি ও ডিলার পর্যায়ে দাম বাড়ায় খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।
আটা-ময়দাসহ বিভিন্ন কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে সম্প্রতি বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। তবে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যবসায়ী নেতাদের বৈঠকের পর উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যয় যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হওয়ায় রুটি ও বিস্কুটের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত রয়েছে।
কমছে না মুরগি-ডিমের দাম
বাজারে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দামও বাড়তি। বর্তমানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৯০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেড় মাস আগে দাম ছিল প্রায় ২০ টাকা কম। এর আগে অবশ্য ব্রয়লারের দাম কেজিতে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় নেমেছিল।
ফার্মের বাদামি ডিমের এক ডজন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১৫০ টাকায়। সাদা ডিমের দাম প্রায় ১০ টাকা কম। এ ছাড়া সোনালি মুরগি প্রতি কেজি ৩৪০ থেকে ৩৬০ টাকা এবং হাইব্রিড বা কালারবার্ড সোনালি ৩০০ থেকে ৩৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিক্রেতাদের দাবি, গত কয়েক মাসে বন্যা, অতিবৃষ্টি ও অতিরিক্ত গরমের কারণে অনেক খামারে ডিম উৎপাদন ও ব্রয়লার মুরগির সংখ্যা কমেছে। এতে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় দাম কমছে না।
মাছেও স্বস্তি নেই
মুরগি ও ডিমের পাশাপাশি মাছের বাজারেও ক্রেতাদের জন্য স্বস্তি নেই। আড়াই থেকে তিন কেজি ওজনের রুই প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৪২০ টাকা এবং কাতলা ৪২০ থেকে ৪৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আকারভেদে চাষের পাঙাশ ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা এবং পাবদা ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
তবে অন্যান্য নিত্যপণ্যের তুলনায় সবজির বাজারে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা দেখা গেছে। বিক্রেতারা বলছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকায় অধিকাংশ সবজির দাম আগের অবস্থায় রয়েছে।
কমছে সংসারের বাড়তি খরচ
নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, ঘরের সাজসজ্জা এবং বাইরে খাওয়াসহ বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে দিয়েছেন। পুরোনো জিনিসও যতদিন সম্ভব ব্যবহার করছেন অনেকে।
মালিবাগের বাসিন্দা সরকারি কর্মকর্তা মো. সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, আগে ছুটির দিনে পরিবার নিয়ে বাইরে খাওয়া বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া স্বাভাবিক বিষয় ছিল। এখন বাড়তি খরচের কথা চিন্তা করে সেসবও কমিয়ে দিতে হচ্ছে। মাসের শেষ দিকে কয়েক হাজার টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ও বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী মিজানুর রহমান জানান, আগে মাসে অন্তত একবার পরিবার নিয়ে বাইরে খেতে গেলেও এখন সেটি বন্ধ করেছেন। পোশাক কেনাকাটাও ঈদকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। সন্তানদের অনেক আবদার থাকলেও সব পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান তিনি।
ফলে বাজারে সবজিতে কিছুটা স্বস্তি এলেও আটা-ময়দা, মাছ, মুরগি ও ডিমের বাড়তি দামে সাধারণ মানুষের সংসার চালানোর চাপ আরও বেড়েছে।
