ঢাকা-৫ নির্বাচনি এলাকায় চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অপরাধী চক্র ও রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে সংঘাত, অস্ত্রের মহড়া, হামলা ও হত্যার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলেও প্রশাসনের কার্যকর তৎপরতা দৃশ্যমান নয়।
যাত্রাবাড়ী, ডেমরা ও কদমতলীর একাংশে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়ই গোলাগুলি, হামলা ও হত্যার ঘটনা ঘটছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। একই সঙ্গে চাঁদাবাজির অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যেও বিরোধ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে যাত্রাবাড়ীর সাদ্দাম মার্কেট এলাকায় দুই লাখ টাকা চাঁদাবাজির বিরোধকে কেন্দ্র করে অটোরিকশা গ্যারেজের মালিক সাগর খান ওরফে ইমরানকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে। পরদিন নিহতের স্ত্রী যাত্রাবাড়ী থানায় হত্যা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা করেন। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এর আগে গত ২৩ জুলাই ডেমরার সামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির নির্বাচন বানচালের চেষ্টায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির সামনে তিনটি ফাঁকা গুলি ছোড়া ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ সময় জামায়াত ও বিএনপির নেতাকর্মীরা পাল্টাপাল্টি মিছিল ও বিক্ষোভ করেন।
এরপর ২৮ আগস্ট ভোরে সারুলিয়ায় ডেমরা থানা বিএনপির আহ্বায়ক রেজা চৌধুরী সেলিমের বাড়িতে চারটি মোটরসাইকেলে আসা ৮-৯ জন হেলমেটধারী ব্যক্তি তিন রাউন্ড গুলি ছোড়ে বলে অভিযোগ করা হয়। মাদক কারবারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে এ হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেন রেজা চৌধুরী। এ ঘটনায় তিনি ডেমরা থানায় মামলা করেন।
রেজা চৌধুরী বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় তাঁর বাসায় গুলি চালানো হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ আমলে মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে ছাত্রদল নেতা মাসুদ নতুন করে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করায় তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে নিষেধ করা হয় বলেও দাবি করেন তিনি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অপরাধী গ্রুপগুলোর আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। গত জাতীয় নির্বাচন ও পরবর্তী সময়ে বিএনপি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরোধের জেরে এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, যাত্রাবাড়ীসহ ঢাকার পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এসব চক্র চাঁদাবাজি, জমি দখল ও মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যাত্রাবাড়ী বাসস্ট্যান্ডে চাঁদা আদায়ের পাশাপাশি বিভিন্ন পরিবহন থেকেও নিয়মিত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এ নিয়ে হামলার ঘটনাও ঘটছে। ফলে পরিবহন শ্রমিক, চালক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়রা বলছেন, যাত্রাবাড়ীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব বন্ধে নিয়মিত নজরদারি এবং কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।
পরিবহন থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে যাত্রাবাড়ীতে ব্যাপক চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন পরিবহন থেকে এককালীন ও দৈনিক ভিত্তিতে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ‘শরীয়তপুর সুপার’ বাস থেকে এককালীন ছয় লাখ এবং প্রতিদিন এক হাজার টাকা, ‘পদ্মা সুপার’ থেকে এককালীন তিন লাখ ও দৈনিক তিন হাজার টাকা, ‘ফেম পরিবহন’ থেকে এককালীন আড়াই লাখ ও প্রতিদিন দুই হাজার টাকা এবং ‘ডিএম পরিবহন’ থেকে প্রতিদিন পাঁচ হাজার টাকা নেওয়া হয়।
এ ছাড়া ‘নড়িয়া সুপার’ থেকে এককালীন আড়াই লাখ ও প্রতিদিন দুই হাজার টাকা, ‘পদ্মা এসি পরিবহন’ থেকে এককালীন দুই লাখ ও দৈনিক দুই হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
সোনালী, সার্বিক ও গোল্ডেন লাইন পরিবহন থেকে এককালীন চার লাখ ও দৈনিক ছয় হাজার টাকা চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। রাজিব ও সাধ পরিবহন থেকে গাড়িপ্রতি দৈনিক এক হাজার টাকা, হটলাইন কাউন্টার থেকে প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা এবং গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য প্রতিটি গাড়ি থেকে ১০০ টাকা করে প্রতিদিন প্রায় ৩০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
ডেমরা-যাত্রাবাড়ী লেগুনা স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন ৩০ হাজার টাকা, সিটি করপোরেশন মার্কেট শাকপট্টি থেকে দৈনিক ৩০ হাজার টাকা এবং সিটি করপোরেশন মার্কেট থেকে দৈনিক দুই লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া যাত্রাবাড়ী-জুরাইন লেগুনা স্ট্যান্ড থেকে দৈনিক ১০ হাজার টাকা, ৫০ নম্বর ওয়ার্ডে মাদক কারবার থেকে প্রতিদিন ৩০ হাজার টাকা এবং যাত্রাবাড়ী-চট্টগ্রাম রোড লেগুনা স্ট্যান্ড থেকে দৈনিক ১০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগগুলোর নেপথ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতা নবী উল্লাহ নবীর নামও এসেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।
লেগুনা, ফুটপাত ও পরিবহনেও চাঁদাবাজির অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, ডেমরা-স্টাফ কোয়ার্টার লেগুনা স্ট্যান্ড থেকে শিপন ও ফেরদৌস হোসেনের মাধ্যমে চাঁদা সংগ্রহ করা হয়। বাহাদুর শাহ পরিবহন থেকে শিপন, আসমানী ও আলিফ পরিবহন থেকে রফিক, রাজধানী পরিবহন থেকে মাসুদ রানা এবং অছিম পরিবহন থেকে প্রকাশ ও ফেরদৌস হোসেন রনির মাধ্যমে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে স্টাফ কোয়ার্টার এলাকার ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে রফিক এবং সাইনবোর্ড এলাকার ফুটপাত থেকে আজিজ, ফারুক আহমেদ সাদু ও রনির মাধ্যমে চাঁদা সংগ্রহের অভিযোগ করা হয়েছে।
মাটি ভরাট ও জমি দখলের অভিযোগ
শীতলক্ষ্যা নদী এলাকায় হজরত আলী ও রনির মাধ্যমে চাঁদা সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। ৬৭ নম্বর ওয়ার্ডে মাসুদ রানা ও রনির মাধ্যমে জমি দখল এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ৬৯ নম্বর ওয়ার্ডে প্রকাশ ও রনির মাধ্যমে ড্রেজার বসিয়ে মাটি ভরাট এবং অবৈধভাবে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ৭০ নম্বর ওয়ার্ডে নিষিদ্ধ যুবলীগ নেতা সম্রাটের সহযোগী হিসেবে পরিচিত মোফাজ্জল হোসেন ভুঁইয়ার মাধ্যমে জমি ভরাট ও দখলের অভিযোগ করা হয়েছে। পরে আজিজ ও রনির মাধ্যমে চাঁদা আদায় করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণেও চাঁদার অভিযোগ
বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ৬৬ নম্বর ওয়ার্ডে হেলাল, ৬৭ নম্বর ওয়ার্ডে মাসুদ রানা ও রনি এবং ৬৯ নম্বর ওয়ার্ডে প্রকাশ, আল-আমিন ও তোফাজ্জলের মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়া হয়। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার নাম রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ ছাড়া বাস্তুহারা লীগ ঢাকা দক্ষিণের সভাপতি শাহীনের ভাই ও সাবেক যুবদল নেতা মুশফিকুর রহমান ফাহিমের বিরুদ্ধেও যাত্রাবাড়ীর কয়েকটি কাউন্টার থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। চাঁদা না দেওয়ায় তাঁর কথিত টর্চার সেলে এক যুবককে নির্যাতনের ভিডিও প্রকাশের পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করেছিল বলে জানা গেছে। সম্প্রতি কারাগার থেকে বের হয়ে প্রভাবশালী নেতাদের আশ্রয়ে তিনি আবারও চাঁদাবাজিতে জড়িয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।
অভিযোগ অস্বীকার নবী উল্লাহর
অভিযোগের বিষয়ে নবী উল্লাহ নবী বলেন, ঢাকা-৫ আসনের এমপি সংসদে চাঁদাবাজির কথা বলেছেন, তবে নির্দিষ্টভাবে তাঁর কথা বলেননি। তাঁর দাবি, চাঁদাবাজির সঙ্গে বহিরাগত, আওয়ামী লীগের ‘গুপ্তবাহিনী’ কিংবা অন্য কেউ জড়িত থাকতে পারে।
তিনি বলেন, যাত্রাবাড়ীতে রাজনৈতিক কোন্দল বা আধিপত্য বিস্তারের কোনো ঘটনা নেই। স্থানীয় জনগণের কাছ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ পাওয়ার পর বিএনপির হাইকমান্ড কমিটি ভেঙে দিয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট একটি পক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করছে বলে দাবি করেন তিনি।
নবী উল্লাহ আরও বলেন, তিনি সব সময় চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং এখনো রয়েছেন। চাঁদাবাজির ভাগ না পাওয়ার বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ফেক আইডি খুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে এবং অভিযোগগুলো সত্য নয়।
পুলিশের বক্তব্য
যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মোহাম্মদ রাজু বলেন, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণের জন্য কেউ মাসোহারা নিচ্ছে—এমন তথ্য পুলিশের কাছে নেই। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
গাড়ি পার্কিং নিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি ট্রাফিক বিভাগ দেখছে। পাশাপাশি যাত্রাবাড়ীতে যানজট নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
এমপির দাবি
ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল হোসেন বলেন, নবী উল্লাহ নবী কিছুদিন আগে নিজেই কোটি কোটি টাকা চাঁদাবাজির কথা স্বীকার করেছেন এবং তাঁকে ভাগ দেওয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, বিভিন্ন এলাকা থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ আসছে।
