ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও এখনো পরবর্তী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়নি। নির্দিষ্ট সময়সীমা বা নির্বাচন আয়োজনের রোডম্যাপও জানায়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এতে ক্যাম্পাসে নতুন নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দ্রুত তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে এক বছর ডাকসুর মেয়াদ কার্যকর থাকে। গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর বিজয়ী প্রতিনিধিরা ১৪ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ফলে চলতি বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান নেতারা সর্বোচ্চ ৯০ দিন রুটিন দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।
দীর্ঘ ২৮ বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৯ সালের মার্চে ডাকসু ও হল সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে ২০২০ সালে ওই কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আর নির্বাচন হয়নি। পরবর্তীতে দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর আবার ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়নি। ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত ডাকসু নির্বাচন হয়েছে ৩৮ বার। স্বাধীনতার পর ৫৪ বছরে নির্বাচন হয়েছে মাত্র আটবার। বিভিন্ন সময়ে তফসিল ঘোষণা ও নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা কারণে ভোটগ্রহণ হয়নি। ১৯৯১ সালে নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পরও সহিংসতার কারণে নির্বাচন স্থগিত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৪, ১৯৯৫, ১৯৯৬, ১৯৯৮ ও ২০০৫ সালেও নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি।
নতুন ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে গত ২০ আগস্ট প্রথম বৈঠক করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সেখানে নির্বাচনী প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা এবং আবাসিক হলগুলোর পরিস্থিতি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য হল প্রাধ্যক্ষদের প্রতিবেদন দিতে এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে পর্যায়ক্রমে বৈঠক করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এদিকে গত ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে ছাত্রদল-সমর্থিত নির্বাচিত প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ছাত্রদল নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে আগামী নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের আরও বেশি সমর্থন পাওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, ডাকসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিয়মিত প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন নির্বাচন না হওয়ায় এর ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছিল। এবারও নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে এক-দুই মাস সময় এদিক-সেদিক হতে পারে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে একটি বৈঠক হয়েছে, তবে সেখানে কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আরও আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও চর্চার অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্ম ডাকসু। তাঁর সংগঠন সব সময় ডাকসু নির্বাচনের পক্ষে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। নির্বাচন আয়োজনের সময় প্রশাসনই নির্ধারণ করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ডাকসুর এজিএস ও ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মহিউদ্দিন খান বলেন, ছাত্রশিবির অবিলম্বে ডাকসু নির্বাচন চায়। তাঁর দাবি, দ্রুত তফসিল ঘোষণা করা হোক। নির্বাচন সামনে রেখে সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া জাতীয় ছাত্রশক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হাসিব আল ইসলাম, জাতীয় ছাত্রসভার সংগঠক শিমু আক্তার এবং বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সামি আব্দুল্লাহও দ্রুত ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন।
বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রশাসন নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করলেও এখনো তফসিল বা নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করেনি। ফলে বর্তমান নেতাদের ৯০ দিনের রুটিন দায়িত্বের সময়সীমার মধ্যেই নির্বাচন আয়োজন করা হবে কি না, নাকি আরও সময় লাগবে—এ বিষয়টি এখনো অনির্ধারিত রয়েছে।







