আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মেঘনা ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল দলটির কোষাধ্যক্ষ ও সাবেক মন্ত্রী আশিকুর রহমানের হাতে। অন্যদিকে, মিডল্যান্ড ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহ। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংক দুটির পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আসে। মেঘনা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হন প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক উজমা চৌধুরী। আর মিডল্যান্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান একই গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আহসান খান চৌধুরী। সম্পর্কে তাঁরা ভাই-বোন। তবে নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংক দুটিতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে মেঘনা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সময় উজমা চৌধুরী ছিলেন ব্যাংকটির অন্যতম উদ্যোক্তা। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ব্যাংকটি আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আশিকুর রহমানের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে। এরপর উজমা চৌধুরীকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়।
অন্যদিকে, ২০১৩ সালে মিডল্যান্ড ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সময় আহসান খান চৌধুরীও অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন। ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্লাহর নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে জানা গেছে। সর্বশেষ তাঁর স্ত্রী নিলুফার জাফরউল্লাহ ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় অনুপস্থিত থাকতে শুরু করেন। এ পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের ২০ মার্চ অনুষ্ঠিত ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের ১৬৫তম সভায় আহসান খান চৌধুরীকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়।
দুই ব্যাংকেই বেড়েছে খেলাপি ঋণ
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নতুন চেয়ারম্যানরা দায়িত্ব নেওয়ার পর মেঘনা ও মিডল্যান্ড ব্যাংক—দুটিতেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে।
মেঘনা ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ উজমা চৌধুরী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের আগে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। চলতি বছরের জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৩৩ কোটি টাকায়। সে সময় মোট ঋণের ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ ছিল খেলাপি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মেঘনা ব্যাংকের চেয়ারম্যান উজমা চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন আমার দেশ-এর প্রতিবেদক। প্রতিবেদকের পরিচয় জানার পর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর সাড়া দেননি। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মিজানুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর নম্বর ব্যস্ত পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, আহসান খান চৌধুরী মিডল্যান্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার আগে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। চলতি বছরের জুন শেষে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪১২ কোটি টাকায়। ওই সময় ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ ছিল খেলাপি।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মিডল্যান্ড ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমতিয়াজ ইউ আহমেদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন ধরেননি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
একই পরিবারের দুই সদস্য দুই ব্যাংকের চেয়ারম্যান
ব্যাংকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, একই পরিবারের দুই ভাই-বোনের দেশের দুটি তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে প্রথম। তাঁদের মতে, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণে থাকা ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির প্রবণতা আগেও দেখা গেছে।
তবে ব্যাংক দুটির খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির সঙ্গে নতুন চেয়ারম্যানদের দায়িত্ব গ্রহণের সময়ের সম্পর্ক থাকলেও, শুধু এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে ঋণখেলাপি বাড়ার জন্য তাঁদের ব্যবস্থাপনাকে সরাসরি দায়ী করা যায় না। এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ঋণ বিতরণ, ঋণ আদায়, পূর্ববর্তী ঋণের মান এবং খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যান্য কারণ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
