ইসরাইলে জাতীয় নির্বাচনের আর এক মাসেরও কম সময় বাকি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা এবং এরপর প্রায় তিন বছর ধরে গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে চলা সংঘাত দেশটির রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। আসন্ন নির্বাচন সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট এবং সাবেক সামরিক প্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির—দুই পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে দূরে রয়েছে। ফলে নির্বাচনের পর নেসেটে আবারও কোনো দল বা জোটের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জরিপে কাছাকাছি অবস্থানে দুই শিবির
সাম্প্রতিক চ্যানেল ১৩-এর একটি জরিপে দেখা গেছে, নেতানিয়াহু-বিরোধী ইহুদি দলগুলো সম্মিলিতভাবে ৫২টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেতে পারে ৫১টি আসন।
জরিপ অনুযায়ী, গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি ২২টি এবং নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ১৮টি আসন পেতে পারে। তবে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনে পৌঁছাতে পারছে না।
আইজেনকটের রাজনৈতিক অবস্থান
গাদি আইজেনকট ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সেসের (আইডিএফ) সাবেক চিফ অব স্টাফ। গাজায় যুদ্ধের সময় তার ছেলে ও দুই ভাতিজা নিহত হন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলার পর নেতানিয়াহু যে ঐক্য সরকার গঠন করেছিলেন, আইজেনকটও প্রায় আট মাস সেই সরকারের অংশ ছিলেন।
তবে বর্তমানে তিনি নেতানিয়াহু সরকারের বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার সামনে বড় একটি রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা হলো—ইসরাইলি আরব নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী কয়েকটি দলের সঙ্গে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা তিনি নাকচ করেছেন। ফলে বিরোধী দলগুলোর সম্মিলিত আসনসংখ্যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি গেলেও সরকার গঠনের সমীকরণ জটিল হয়ে রয়েছে।
নেতানিয়াহুর প্রচারে জাতীয় নিরাপত্তা
অন্যদিকে নেতানিয়াহু তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি ইসরাইলের দীর্ঘসময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রীদের একজন এবং লিকুদ পার্টির নেতৃত্বে একাধিকবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
তবে তার নেতৃত্বাধীন জোটের ভেতরেও বিভিন্ন ইস্যুতে চাপ রয়েছে। বিশেষ করে আল্ট্রা-অর্থোডক্স বা হারেদি ইহুদিদের সামরিক নিয়োগ থেকে অব্যাহতির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
হারেদিদের সামরিক নিয়োগ নিয়ে বিরোধ
২০২৪ সালে ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্ট হারেদি পুরুষদের সামরিক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি অব্যাহত রাখার আইনি ভিত্তি নেই বলে রায় দেওয়ার পর বিষয়টি আরও উত্তপ্ত হয়। নেতানিয়াহুর জোটের গুরুত্বপূর্ণ হারেদি দলগুলো এ বিষয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে।
এদিকে যুদ্ধনীতি, সামরিক বাধ্যতামূলক নিয়োগ এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও দেশটির ভোটারদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের মত ও অসন্তোষ রয়েছে। ফলে নিরাপত্তা ইস্যুর পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়গুলোও নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জীবনযাত্রার ব্যয়ও নির্বাচনী ইস্যু
নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অর্থনীতি। আঞ্চলিক সংঘাত ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের প্রভাবে ইসরাইলে খাদ্যের দাম গত দুই বছরে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধের প্রভাব, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অর্থনৈতিক চাপ নিয়েও ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
সরকার গঠনের সমীকরণই বড় প্রশ্ন
ইসরাইলে আগামী ২৭ অক্টোবর ২০২৬ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর এটিই দেশটির প্রথম জাতীয় নির্বাচন।
বর্তমান জরিপগুলো কোনো পক্ষের সরকার গঠনের স্পষ্ট চিত্র দিচ্ছে না। প্রধান দুই রাজনৈতিক শিবিরের কেউই এককভাবে ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি নেই। ফলে নির্বাচনের পর বিভিন্ন দলের মধ্যে জোট গঠন, সমর্থন আদায় এবং পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করার সমীকরণই পরবর্তী সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
