বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিদেশি স্টেশনগুলোতে অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার নানা অভিযোগ উঠেছে। উড়োজাহাজের কারিগরি ত্রুটি মোকাবিলায় অসহযোগিতা, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পাস ছাড়াই দায়িত্ব পালন, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, কনটেইনার নিয়ে অব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। এর পাশাপাশি স্বজনপ্রীতি ও পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ছাড়াই গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মকর্তাদের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি রোম, সিঙ্গাপুর, কুয়েত, ব্যাংকক ও মদিনার বিভিন্ন ঘটনায় বিদেশি স্টেশনগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, রোমে কারিগরি ত্রুটির কারণে যাত্রীসহ একটি উড়োজাহাজ ৪০ ঘণ্টার বেশি সময় আটকে থাকলেও স্টেশন ম্যানেজার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। কুয়েতে স্টেশন ম্যানেজারের বিরুদ্ধে ব্যাগেজসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংককে প্রকৌশলীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। অন্যদিকে, মদিনায় কনটেইনারের প্রয়োজনীয় তথ্য যথাসময়ে ঢাকায় না পৌঁছানোয় ওমরাহ যাত্রীদের জমজমের পানি সংগ্রহে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
যুগান্তরের অনুসন্ধানে বিদেশি স্টেশনগুলোতে সমন্বয়হীনতা, গাফিলতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতার বিভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এসব সমস্যা অব্যাহত থাকলে যাত্রীসেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, বিদেশি স্টেশনগুলোতে দক্ষতা ও জবাবদিহির অভাব সরাসরি যাত্রীসেবা এবং ফ্লাইট পরিচালনায় প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্ট আইন, নিরাপত্তাবিধি ও পরিচালন কার্যক্রম সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা জরুরি। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া এবং যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পদায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, বিদেশি স্টেশনগুলো নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ধরনের অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলা বরদাশত করা হবে না বলেও তিনি জানান।
মদিনায় জমজমের পানি নিয়ে ভোগান্তি
মদিনা স্টেশন ম্যানেজার মিজানুর রহমানের গাফিলতির কারণে জমজমের পানি নিয়ে ওমরাহ যাত্রীদের ভোগান্তির অভিযোগ উঠেছে। বিমানের বিজি-৩৩৮ ফ্লাইটে আনা ১৮টি কনটেইনারের মধ্যে ১৭টি নির্ধারিত সময়ে নামানো হলেও জমজমের পানি থাকা ১৮ নম্বর কনটেইনারটি পড়ে থাকে। এ ছাড়া কনটেইনারটির প্রয়োজনীয় তথ্য ঢাকার ব্যাগেজ কন্ট্রোল বিভাগকে যথাযথভাবে জানানো হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে যাত্রীদের কাছে জমজমের পানি পৌঁছাতে বিলম্ব হয়।
এ ঘটনায় বিমানের দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডার ঘটনায় গ্রেপ্তার হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর আক্তারুজ্জামান।
বিমানসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ মদিনা স্টেশনের দায়িত্বে থাকা মিজানুর রহমানের গ্রাউন্ড সার্ভিস ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ছিল না। সংশ্লিষ্ট কাজে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় সমন্বয়হীনতা ও গাফিলতির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রোমে নিরাপত্তা পাস ছাড়াই দায়িত্ব পালনের অভিযোগ
যুগান্তরের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, গত আগস্টে ইতালির রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে কারিগরি ত্রুটির কারণে বিমানের বোয়িং উড়োজাহাজের বিজি-৩০৬ ফ্লাইট অচল হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঢাকা থেকে উদ্ধার সরঞ্জামসহ প্রকৌশল বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ ও ইশাক বাবুকে পাঠানো হয়।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের অভিযোগ, রোমে পৌঁছে তাঁরা স্টেশন ব্যবস্থাপনায় চরম সমন্বয়হীনতার মুখে পড়েন। তাঁদের দাবি, সেখানকার কান্ট্রি ম্যানেজার ও স্টেশন ম্যানেজার দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় বিমানবন্দর নিরাপত্তা পাস ছাড়াই দায়িত্ব পালন করছিলেন। ফলে উদ্ধারকারী দলের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ছাড়পত্রের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। এতে প্রকৌশলীদের দীর্ঘ সময় টার্মিনালে অপেক্ষা করতে হয়।
প্রকৌশলীদের দাপ্তরিক চিঠি অনুযায়ী, তাঁরা মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে উড়োজাহাজটিকে পুনরায় উড্ডয়নের উপযোগী করেন। কিন্তু ফ্লাইটটি রোম ছেড়ে যাওয়ার পর স্টেশনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁদের সেখানে রেখে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে গভীর রাতে পাসপোর্ট ও লাগেজসহ বিদেশি বিমানবন্দরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়েন প্রকৌশলীরা। পরে নিজেদের খরচে ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলে যেতে হয় তাঁদের।
রোম স্টেশনের কান্ট্রি ম্যানেজার আব্দুল্লাহ আল হোসাইনের বিরুদ্ধেও অসহযোগিতার অভিযোগ তুলেছেন প্রকৌশলীরা।
সিঙ্গাপুরে কারিগরি ত্রুটিতে ফ্লাইট পরিচালনায় বিঘ্ন
গত ৩১ আগস্ট সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরে বিমানের বিজি-৫৮৫ ফ্লাইটে বড় ধরনের কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। ১৫১ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রার প্রস্তুতিকালে উড়োজাহাজটির ককপিটের আর-৪ উইন্ডোতে ফাটল ধরা পড়ে।
এরপর প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ সরবরাহের ক্ষেত্রে স্টেশন ব্যবস্থাপনা ও সাপ্লাই চেইন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রকাশ পায়। বিকল্প এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে যন্ত্রাংশ পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও এয়ারওয়ে বিল এবং চাঙ্গি বিমানবন্দরের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রসংক্রান্ত জটিলতায় তা সফল হয়নি। ফলে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। পরে ঢাকা থেকে নির্ধারিত ফ্লাইটে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও অতিরিক্ত প্রকৌশলী পাঠানো হয়।
কুয়েত স্টেশনে স্বামী-স্ত্রীর পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন
বিমানের কুয়েত স্টেশনে স্বামী-স্ত্রীকে পদায়ন নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষের কথা জানা গেছে। স্টেশন ম্যানেজার মোহাম্মদ শাহজাহানের বিরুদ্ধে ব্যাগেজসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত চলাকালেই একই স্টেশনে তাঁর স্ত্রী শামীমা পারভীনকে পদায়ন করা হয়। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ২৩ জানুয়ারি কুয়েত থেকে বিজি-৩৪৪ ফ্লাইটে ১৯৩ জন যাত্রী ঢাকায় আসেন। বিমানবন্দরে অবতরণের পর নিরাপত্তা বিভাগের আকস্মিক অভিযানে ১৪ জন যাত্রীর লাগেজ পরীক্ষা করে ১২ জনের লাগেজে নির্ধারিত সীমার চেয়ে অতিরিক্ত ওজন পাওয়া যায়।
অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত ব্যাগেজের জন্য যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের যথাযথ হিসাব সরকারি খাতে পাওয়া যায়নি। অনেক যাত্রীকে অর্থ গ্রহণের রসিদও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় শাহজাহানের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তাঁর স্ত্রীকে একই স্টেশনে পদায়ন করায় স্বজনপ্রীতির প্রশ্ন সামনে এসেছে। শামীমা পারভীন এর আগে বিমানের গ্রাউন্ড সার্ভিস বিভাগে কর্মরত ছিলেন।
ব্যাংককে প্রকৌশলীদের সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ
গত ১ সেপ্টেম্বর থাইল্যান্ডের ব্যাংকক বিমানবন্দরে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিমানের একটি উড়োজাহাজ দীর্ঘ সময় গ্রাউন্ডেড অবস্থায় ছিল। এ সমস্যা সমাধানে ঢাকা থেকে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী দল পাঠানো হলেও বিমানবন্দরে স্টেশন ম্যানেজারকে পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর ফলে প্রকৌশলীদের প্রয়োজনীয় অনুমতি সংগ্রহ এবং কারিগরি সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হয়। এতে উড়োজাহাজের সমস্যা সমাধান ও কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে বাড়তি ভোগান্তির সৃষ্টি হয়।
বিদেশি স্টেশন ব্যবস্থাপনায় নতুন কড়াকড়ি
পরপর এসব ঘটনার পর বিদেশি স্টেশনগুলোর ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে কঠোরতা আরোপ করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। করপোরেট পলিসি ম্যানুয়েল ও জব ডেসক্রিপশন ম্যানুয়েল অনুসারে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিশ্চিত করতে জরুরি প্রশাসনিক নির্দেশনা জারি করা হয়।
নির্দেশনায় নতুন পদায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পদের দায়িত্ব ও জবাবদিহি লিখিতভাবে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। বিদেশি স্টেশনে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কারিগরি জ্ঞান, দক্ষতা ও সংশ্লিষ্ট কাজের সক্ষমতা নিশ্চিত করার শর্তও যুক্ত করা হয়েছে।
এ ছাড়া গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিদেশি স্টেশনে বদলি ও পদায়নসংক্রান্ত আরেকটি প্রশাসনিক আদেশ জারি করা হয়। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, বিদেশি স্টেশনে বদলি বোর্ডের সভাপতি করা হয়েছে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে। বোর্ডের সদস্য থাকবেন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ডিসিইও, সব পরিচালক এবং মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ)। নির্দিষ্ট বিভাগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পরিচালকের মনোনীত বিভাগীয় প্রধানকেও সদস্য করার বিধান রাখা হয়েছে।
বিমানসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, বিদেশি স্টেশনগুলোতে কর্মকর্তা পদায়নের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, কারিগরি দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই নতুন কাঠামো গঠন করা হয়েছে।
তবে প্রশাসনিক নির্দেশনা জারির পাশাপাশি অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা এবং বিদেশি স্টেশনগুলোর কার্যক্রমে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
