২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণা করা হবে আগামী শুক্রবার। বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও মানবিক সংকটের মধ্যেই এবারের পুরস্কার নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। নরওয়ের রাজধানী অসলো থেকে বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টায় নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়র্গেন ওয়াটনে ফ্রাইডনেস বিজয়ীর নাম ঘোষণা করবেন।
এবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মোট ২৮৭টি মনোনয়ন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ২০৮ জন ব্যক্তি এবং ৭৯টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে নোবেল কমিটি মনোনীতদের আনুষ্ঠানিক তালিকা প্রকাশ করে না। নিয়ম অনুযায়ী, মনোনয়ন-সংক্রান্ত নথি ৫০ বছর পর্যন্ত গোপন রাখা হয়। ফলে পুরস্কার ঘোষণার আগে যেসব নাম আলোচনায় আসে, সেগুলো মূলত মনোনয়নদাতা, বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সামনে আসে।
শেষ মুহূর্তের আলোচনায় যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে মানবিক সহায়তা দেওয়া সংগঠন, আন্তর্জাতিক আদালত, সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতা এমনকি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের নামও রয়েছে।
পোপ লিও, আন্তর্জাতিক আদালত ও ফ্রান্সেসকা আলবানিজ
রয়টার্সের বিশ্লেষণে এবারের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে পোপ লিও, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি), আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং জাতিসংঘের ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজের নাম উঠে এসেছে।
পোপ লিও যুদ্ধ বন্ধ, সংলাপ এবং বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের পক্ষে নিয়মিত বক্তব্য দিয়ে আসছেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বৈশ্বিক অস্থিরতার সময়ে তার শান্তির আহ্বান তাকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের আলোচনায় এনেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ভূমিকার জন্য আইসিসি ও আইসিজের নামও আলোচনায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধান নোবেল শান্তি পুরস্কারের অন্যতম মূল লক্ষ্য হওয়ায় এই দুই আদালতকে পুরস্কৃত করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে গাজা ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে অবস্থানের কারণে ফ্রান্সেসকা আলবানিজও আলোচনায় রয়েছেন। তবে তার প্রার্থিতা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হতে পারে বলে মনে করছেন কিছু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক।
আলোচনায় ট্রাম্পের নামও
এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কারের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিভিন্ন দেশের কয়েকজন নেতা প্রকাশ্যে তাকে মনোনয়ন দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। যদিও নোবেল কমিটি এসব মনোনয়ন নিশ্চিত করেনি।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন বিশেষজ্ঞ ট্রাম্পের পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম বলে মনে করেছেন। তাদের মতে, গত বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারকে ঘিরে ট্রাম্পকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেটিও এবারের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২৫ সালের শান্তিতে নোবেলজয়ী ভেনেজুয়েলার মারিয়া কোরিনা মাচাদো পরবর্তী সময়ে তার নোবেল পদক ট্রাম্পকে উপহার দেওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ফলে এবার এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কি না, যা পুরস্কারকে আবারও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসবে—সেটিও পর্যবেক্ষকদের আলোচনায় রয়েছে।
সুদানের স্বেচ্ছাসেবকেরাও সম্ভাব্য তালিকায়
যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানের ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস’-এর নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। ২০২৩ সালে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের গড়ে তোলা এই নেটওয়ার্ক বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষের জন্য খাবার, চিকিৎসা, নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং জরুরি সহায়তা দিয়ে আসছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার পরিস্থিতিতে স্থানীয় নাগরিকদের এই উদ্যোগ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসলো (পিআরআইও)-এর পরিচালক হাকন গ্যেরলভের ২০২৬ সালের আলোচিত প্রার্থীদের তালিকাতেও সুদানের ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমসের নাম রয়েছে।
ইউক্রেনের মাইকোলা কুলেবাও আলোচনায়
ইউক্রেনের শিশু অধিকারকর্মী মাইকোলা কুলেবা এবং তার সংগঠন ‘সেইভ ইউক্রেন’-এর নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে উঠে এসেছে। যুদ্ধের সময় রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া ইউক্রেনীয় শিশুদের উদ্ধার এবং তাদের পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনে সংগঠনটি কাজ করেছে।
পিআরআইও-এর আলোচিত তালিকায় কুলেবার পাশাপাশি শিশুদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন-এর নামও রয়েছে। যুদ্ধের সময় শিশুদের সুরক্ষা ও অধিকারকে সামনে আনার মাধ্যমে শান্তি ও মানবিক নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরাই এর সম্ভাব্য বার্তা হতে পারে বলে জানিয়েছে পিআরআইও।
সাংবাদিকদের সুরক্ষায় সিপিজে
বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনাও এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কারের আলোচনায় এসেছে। এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রয়েছে কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিজম (সিপিজে)।
পিআরআইও-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৩২ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছেন। সাংবাদিকদের ওপর হামলা, বিশেষ করে যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তা এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের কারণে সিপিজের নাম আলোচনায় এসেছে।
অপ্রত্যাশিত প্রার্থী আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন
এবারের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী নামগুলোর একটি হলো ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন (আইএসএস)।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউরোপ, জাপান ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে যৌথভাবে মহাকাশ স্টেশনটি পরিচালনা করছেন। ফলে পৃথিবীর বাইরে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি বিরল উদাহরণ হিসেবে আইএসএসকে বিবেচনা করা হয়।
পিআরআইও-এর পরিচালক গ্যেরলভের ২০২৬ সালের তালিকাতেও আইএসএস রয়েছে। তার যুক্তি, পৃথিবীতে ভূরাজনৈতিক বিভাজন বাড়লেও মহাকাশে এই প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সহযোগিতার দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
এবারের পুরস্কার কেন গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যখন একাধিক বড় সংঘাত ও মানবিক সংকট চলছে, তখন এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কারের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ইউক্রেন, সুদান ও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা নিয়েও বিতর্ক বাড়ছে।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির সচিব ক্রিস্তিয়ান বের্গ হারপভিকেন সম্প্রতি রয়টার্সকে বলেছেন, পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দিকে কমিটি গভীরভাবে নজর রাখছে। বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে এমন কিছু প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা নোবেল শান্তি পুরস্কারের ধারণ করা মূল্যবোধের জন্য হুমকি তৈরি করছে।
তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, বর্তমান সময়ে যারা নতুন ধরনের সহযোগিতা ও শান্তির কাঠামো গড়ে তুলছেন, তাদের কাজও কমিটির বিবেচনায় থাকতে পারে। তবে সম্ভাব্য বিজয়ী বা কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর বিষয়ে তিনি কোনো ইঙ্গিত দেননি।
শেষ মুহূর্তে চমক থাকবে কি?
নোবেল শান্তি পুরস্কারের ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিজয়ী অনুমান করা কঠিন। অতীতেও এমন অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পুরস্কার পেয়েছে, যাদের নাম ঘোষণার আগে খুব বেশি আলোচনায় ছিল না।
তাই ট্রাম্প, পোপ লিও, আন্তর্জাতিক আদালত, ফ্রান্সেসকা আলবানিজ, সুদানের ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস, মাইকোলা কুলেবা ও সেভ দ্য চিলড্রেন, সিপিজে কিংবা আইএসএসের বাইরে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে এবার বেছে নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
নোবেল কমিটি স্পষ্ট করে দিয়েছে, প্রকাশ্যে আসা সম্ভাব্য নামগুলোকে আনুষ্ঠানিক প্রার্থী তালিকা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। মোট ২৮৭টি মনোনয়নের মধ্য থেকে শেষ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নির্বাচিত করা হয়েছে, তা জানা যাবে শুক্রবারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর।







