১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে আধা ঘণ্টারও কম সময়ের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুধু বাংলা বা ভারতবর্ষ নয়, বদলে দিয়েছিল গোটা পৃথিবীর ইতিহাস। লর্ড ক্লাইভের নেতৃত্বাধীন এই রণবিজয় কলকাতার অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার চরিত্র ও উদযাপনের ধরনকেও চিরতরে পাল্টে দিয়েছিল।
বিজয়ের আনন্দে বিভোর ক্লাইভ একে সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ মনে করে কৃতজ্ঞতা জানাতে চাইলেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় সিরাজউদ্দৌলার পূর্ববর্তী আক্রমণ। নবাবের কামানের আঘাবে তছনছ হয়ে যাওয়া ধ্বংসস্তূপ আর জঘন্য বর্ষার মাঝে তখন নতুন করে কিছু করার উপায় ছিল না। ঠিক সেই মুহূর্তে ক্লাইভের ফারসি দোভাষী ও কেরানি, সিরাজের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের অকুণ্ঠ সাহায্যকারী প্রভাবশালী জমিদার নবকৃষ্ণ দেব এক অভিনব পরামর্শ নিয়ে এগিয়ে আসেন।
গির্জার পরিবর্তে দেবী দুর্গার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পরামর্শ দিয়ে নবকৃষ্ণ ও মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র মিলে ১৭৫৭ সালে বিপুল অর্থে শরৎকালীন দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। মূলত পলাশীর যুদ্ধের সেই বিজয়োৎসব পালন করতেই বসন্তকালের দুর্গোৎসবকে শরৎকালে টেনে এনে নবপত্রিকাপুজোর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ‘কোম্পানি পুজো’ নামে খ্যাতি পায়।
ইতিহাসের বয়ানে বলা হয়, সিরাজের গুপ্ত কোষাগার লুটের টাকায় নবকৃষ্ণ এবং ক্লাইভের কৃপায় বার্ষিক পাঁচ লাখ টাকা খাজনা মওকুফ পাওয়া কৃষ্ণচন্দ্র এই পুজোয় লক্ষাধিক টাকা উড়িয়েছিলেন। বিজয়ের উল্লাসে তিন মাসের মধ্যে প্রাসাদতুল্য অট্টালিকা ও নাচঘর তৈরি করে শুরু হয় মেলা। ঠাকুরদালানের ঠিক উল্টোদিকে থাকা নাচঘরে বসে সাহেবরা পুজো দেখার পাশাপাশি বাইজি নাচ ও খানাপিনায় মত্ত থাকতেন।
ব্রিটিশদের মন জোগাতে দিল্লির লখনৌ বা বিদেশ থেকে ‘জ্যান্ত পুতুল’ বা বাইজি এনে মনোরঞ্জনের সব ব্যবস্থা করা হতো। ক্লাইভ খ্রিষ্টান ও মূর্তিপূজার বিরোধী হয়েও স্রেফ রাজনৈতিক স্বার্থে নবকৃষ্ণের বাড়িতে একশ এক টাকা দক্ষিণা ও ফলমূল পাঠিয়েছিলেন এবং উৎসবে উপস্থিতও ছিলেন। এই জাঁকজমক ও তোষামোদের হাত ধরেই কলকাতার আধুনিক দুর্গাপূজার গোড়াপত্তন ঘটেছিল।
তবে গবেষকদের মতে, ক্লাইভের সরাসরি এই পুজায় যোগদানের গল্পটি সম্ভবত নবকৃষ্ণ দেবের নিজের তৈরি করা। তা সত্ত্বেও এই ঘটনাটি অষ্টাদশ শতকের একটি বড় ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রতীক। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ছত্রছায়ায় বাংলার নতুন জমিদার শ্রেণির উত্থান এবং তাদের মাধ্যমে দুর্গাপূজার এই বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটেছিল।
সেকালের নবধনী জমিদারদের কাছে দুর্গাপূজা ছিল নিজেদের সম্পদ ও ক্ষমতা প্রদর্শনের মোক্ষম হাতিয়ার। পাশাপাশি, ব্রিটিশ শাসকদের কাছে নিজেদের আনুগত্য প্রমাণ ও সুসম্পর্ক বজায় রাখাও ছিল এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। গর্ভনর-জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলিকে প্রধান অতিথি করতে পারাটা জমিদারদের কাছে ছিল চরম মর্যাদার বিষয়।
জমিদারদের এই জৌলুসপূর্ণ আয়োজনে ভক্তির চেয়ে লোকদেখানো আড়ম্বরই বেশি প্রাধান্য পেত। এর ফলে গ্রামীণ শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই উৎসব ধীরে ধীরে সাহেব তোষণ ও অভিজাতদের প্রমোদ অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। এমনকি পূজার আচার-অনুষ্ঠানেও নানা সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটেছিল, যেখানে তান্ত্রিক ও লোকজ উপাদানের পাশাপাশি শাক্ত ঐতিহ্যের অঙ্গ হিসেবে ‘কারণবারি’ বা মদের প্রচলনও ছিল।
সময়ের বিবর্তনে বনেদি বাড়ির সেই দরজা সাধারণ মানুষের জন্য ছিল বন্ধ। দরিদ্ররা ঠাকুর দেখতে গেলে দারোয়ানের চাবুক খেয়ে ফিরতে হতো। এই বৈষম্যের প্রতিবাদে এবং সর্বসাধারণের অধিকার নিশ্চিত করতে ১৭৯০ সাল নাগাদ বারোয়ারি পুজোর ধারণা জন্ম নেয়, যা পরবর্তীতে ১৯১০ সালে বাগবাজার সনাতন ধর্মোৎসাহিনী সভার হাত ধরে আধুনিক সর্বজনীন রূপ লাভ করে।
আজ জমিদার বাড়ির সেই ঐতিহ্যবাহী পুজো প্রায় বিলুপ্ত এবং বাংলার জাতীয় ও সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে দুর্গাপূজা। তবে অবাক করা বিষয় হলো, শত শত বছর পেরিয়েও এই উৎসবের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ক্ষমতার সঙ্গে মেলবন্ধন গড়ার সেই পুরোনো ধারা আজও বহাল তবিয়তে টিকে রয়েছে।
