আসামের নগাঁও জেলায় সম্প্রতি পরিচালিত বড় আকারের উচ্ছেদ অভিযানকে কেবল সাধারণ ‘বনাঞ্চল দখলমুক্ত’ করার প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর বোরপানি এবং লুটুমারি-লংজাপ রিজার্ভ ফরেস্টে শত শত মুসলিম পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, যার নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর ও উদ্বেগজনক ভূরাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ। প্রশাসনিকভাবে বনাঞ্চল সুরক্ষার অজুহাত দেওয়া হলেও মূলত বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন এই অঞ্চলে ভারতের একটি বিশাল ও সুপরিকল্পিত ভূগর্ভস্থ মিসাইল ঘাঁটি (Underground Missile Facility) নির্মাণের উদ্দেশ্যেই এই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নগাঁও জেলার সোনাইকুচি রিজার্ভ ফরেস্টের ২৯৯ হেক্টর জমিতে এই আন্ডারগ্রাউন্ড মিসাইল ফ্যাসিলিটি নির্মাণের প্রস্তাব দেয় আসামের ডিগারু এয়ারফোর্স স্টেশন কমান্ডার। প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের মোট ২৯৯ হেক্টর জমির মধ্যে ২৬৫ হেক্টর ব্যবহৃত হবে সুড়ঙ্গ আকৃতির ভূগর্ভস্থ মিসাইল স্ট্রাকচার তৈরিতে, আর বাকি ৩৩ হেক্টর জমি প্রশাসনিক ভবন, নিরাপত্তাচৌকি, সীমানাপ্রাচীর ও ভারী যাতায়াত পথ তৈরিতে ব্যবহার করা হবে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা কমিটি ইতোমধ্যে এই প্রকল্প অনুমোদন করেছে এবং বৈঠকের নথিতে পূর্বাঞ্চলের ‘পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ও অস্থিতিশীলতা’কে মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সহজ ভাষায়, ‘পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি’ বলতে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ও আঞ্চলিক নতুন বাস্তবতাকেই ইঙ্গিত করেছে নতুন দিল্লি। বাংলাদেশ এবং বিশেষ করে সিলেট সীমান্তকে সম্ভাব্য সামরিক হুমকি বিবেচনা করেই আসামের এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলে মিসাইল স্টোরেজ ও লঞ্চিং প্যাড তৈরির তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই নিরাপত্তার দোহাই ও ভূগর্ভস্থ সামরিক স্থাপনা নির্মাণের উদ্দেশ্যেই নগাঁওয়ের বোরপানি ও লুটুমারি বনভূমি থেকে হাজার হাজার মুসলিম পরিবারকে উচ্ছেদ করে এলাকাটিকে সম্পূর্ণ জনমানবহীন ও সামরিক নিয়ন্ত্রাধীন করা হচ্ছে।
সামরিক চক্রান্তের এই ছক কেবল নগাঁওতেই সীমাবদ্ধ নয়; সিলেট সীমান্ত থেকে মাত্র ১৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আসামের ডিগারুতে নির্মিত ব্রাহমোস (BrahMos) মিসাইল কেন্দ্রকে নতুন করে সাজানোর স্যাটেলাইট চিত্র ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে এসেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, যা ২০২৪ সালের শেষভাগেও সবুজ লতাপাতায় ঢাকা সাধারণ বনাঞ্চল ছিল, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে সামরিক গ্রাউন্ড মডিফিকেশনের মাধ্যমে সেখানে নতুন অ্যামুনিশন ডিপো, সাঁজোয়া রিইনফোর্সমেন্ট রুট এবং ভারী মিসাইল পরিবাহী রাস্তার দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করা হয়েছে। একই সাথে সিলেট সীমান্তের মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ কিলোমিটারের মধ্যে অসংখ্য ‘মোবাইল অটোনোমাস লঞ্চার’ (MAL) মোতায়েন করা হয়েছে।
সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়—আসাম জুড়ে চলমান এই সমস্ত মিলিটারি ডেভেলপমেন্ট সরাসরি বাংলাদেশ এবং নির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। একদিকে ভারতীয় সীমানার ভেতর ভৌগোলিক স্ট্র্যাটেজি তৈরি করতে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ ও দমন করা হচ্ছে, অন্যদিকে সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশে অস্থিরতা ছড়াতে সিলেটের আঞ্চলিকতা ও ভাষাকেন্দ্রিক স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোকে উসকে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। ভারতের এই দ্বিমুখী আগ্রাসী নীতি ও সীমান্তঘেঁষা মিসাইল স্থাপনা নির্মাণ বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য এক চরম হুমকির বার্তা বহন করছে।







