বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম দিকপাল, ভাষা আন্দোলনের বীর ভাষাসৈনিক, প্রখ্যাত লেখক এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযম রাহিমাহুল্লাহর ১২তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ। ১৯৪৮ সালের রাজপথ থেকে শুরু করে তৎকালীন ডাকসুর জিএস হিসেবে ভাষা আন্দোলনের স্মারকলিপি পাঠ এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন—তাঁর জীবন ইতিহাসজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে অনন্য এক সোনালী অধ্যায়।
ছাত্রজীবন থেকেই প্রখর মেধা ও অসাধারণ নেতৃত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন অধ্যাপক গোলাম আযম। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র ইউনিয়নের (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হিসেবে পাকিস্তান সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের কাছে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে স্মারকলিপি পাঠ করে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে ইতিহাস গড়েছিলেন। ইসলামী চিন্তা ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে তাঁর রচিত কালজয়ী গ্রন্থগুলো এখনো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চিন্তার খোরাক জোগায় এবং লাখ লাখ মানুষকে সত্য ও ইনসাফের পথে অনুপ্রাণিত করে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, বরং একটি সুসংগঠিত, ত্যাগী ও গণমুখী ইসলামী সংগঠনে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে অধ্যাপক গোলাম আযমের অবদান অবিসংবাদিত। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরাশক্তির প্রবল চক্রান্ত ও বাধার মুখে দাঁড়িয়েও তিনি জামায়াতের নেতাকর্মীদের ঈমানী দৃঢ়তা, সাহসিকতা ও নৈতিক চরিত্র গঠনে পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেন। রাজপথের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম—তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রতিটি পরতে পরতে লুকিয়ে আছে সীমাহীন ত্যাগ ও জেল-জুলুমের করুণ ইতিহাস।
১৯৯২ সালে গোলাম আযমকে কেন্দ্র করে গঠিত ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও বামপন্থীদের তাণ্ডব এবং নাগরিকত্বের ওপর অন্যায় নিষেধাজ্ঞার মুখেও তিনি ছিলেন অটল ও অবিচল। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট যখন তাঁকে পূর্ণ নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়, তখন তা ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাঁর নৈতিক বিজয়ের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হয়। পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতির চরম দুর্দিনে দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় তিনি বিএনপি ও জামায়াতসহ দেশপ্রেমিক শক্তিগুলোর জোটবদ্ধ রাজনীতি গঠনে অনন্য রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দেন।
তৎকালীন ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ৯০ বছরের এই বৃদ্ধ বয়সে তাঁকে অত্যন্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগারের রুদ্ধদ্বার কোঠায় সুচিকিৎসার অভাব ও মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর তিনি শাহাদাত বরণ করেন। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত তিনি একচুলও নীতির সাথে আপস করেননি। তাঁর ইন্তেকালের পর রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত জানাজায় লাখ লাখ তৌহিদী জনতার অভূতপূর্ব ও স্মরণকালের বিশাল জমায়েত প্রমাণ করেছিল—জনগণের হৃদয়ে তাঁর স্থান কতটা গভীরে ছিল।
বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের অভিভাবকতুল্য এই নেতার স্মরণে আজ দেশজুড়ে অগণিত মানুষ তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছেন। মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর জীবনের সমস্ত ভুলত্রুটি মার্জনা করে তাঁকে শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা ও জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন এবং বাংলা ভূখণ্ডে ইসলামী ও দেশপ্রেমিক আন্দোলনের জন্য তাঁর ত্যাগ ও আত্মত্যাগকে কবুল করে নিন—আমিন।
