রাজধানীর কারওয়ান বাজারের মাছের আড়তে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে গ্রেপ্তার হওয়া আদাবর থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. নয়ন হোসেনের একের পর এক চাঞ্চল্যকর অপরাধের চিত্র এখন প্রকাশ্যে আসছে। কারওয়ান বাজার ছাড়াও নিজের নিয়ন্ত্রনাধীন এলাকা আদাবরের মনসুরাবাদ হাউজিং ও আশপাশে চাঁদাবাজি, জোরপূর্বক উন্নয়নকাজ হাতিয়ে নেওয়া এবং খোদ দলীয় নেতার বাড়ি দখলের চেষ্টার মতো নানা অপকর্মের রাজত্ব গড়ে তুলেছিলেন এই ছাত্রদল নেতা।
আদাবরের মনসুরাবাদ হাউজিং এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নয়ন ও তাঁর অনুসারীদের চরম সন্ত্রাসী কার্যকলাপে দীর্ঘদিন ধরে জিম্মि ও অতিষ্ঠ ছিলেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ। বর্তমানে মনসুরাবাদ হাউজিংয়ের ৬ নম্বর সড়কে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় চলা সড়ক সংস্কার ও ড্রেনেজ উন্নয়নকাজের সুযেোগ নিয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল এই চক্র। স্থানীয়দের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, ওই সড়কের ৫০ থেকে ৬০টি ভবনের পানি ও পয়োনিষ্কাশন লাইন সংযোগের কাজ নিজেদের অনুসারী ঠিকাদার ও মিস্ত্রি দিয়ে করাতে বাধ্য করতেন নয়নের লোকজন। কাজ শেষে প্রতিটি বাড়ি থেকে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত মনগড়া বিল দাবি করা হতো এবং টাকা না দিলে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হতো।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ৬ নম্বর সড়কের ৬৯ ও ৭০ নম্বর বাড়ির নালার কাজের জন্য জোরপূর্বক ৫৫ হাজার টাকা দাবি করে নয়নের ক্যাডার বাহিনী। বাড়ির মালিকরা নিজেদের পছন্দমতো দক্ষ মিস্ত্রি দিয়ে কম খরচে কাজ করাতে চাইলে নয়নের অনুসারী পরিচয় দিয়ে চার-পাঁচজন ব্যক্তি এসে তাদের ওপর চরম হুমকি ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। অতিরিক্ত টাকা দিতে অস্বীকার করায় ওই বাড়িওয়ালাকে প্রকাশ্যেই নানামুখী হুমকি দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে হয়।
একই সড়কের অপর একটি বাড়ির নিরাপত্তারক্ষী জানান, অন্য পেশাদার মিস্ত্রি দিয়ে যেই কাজ মাত্র ১০ হাজার টাকায় সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল, সেখানে নয়নের লোকজন তিন ধাপে জবরদস্তি করে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে মোট ২৩ হাজার ৫০০ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। স্থানীয়দের জোরালো দাবি, আদাবর থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নয়ন হোসেন এবং সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মজুমদার জসিমের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে এলাকায় এমব্রয়ডারি কারখানা, ফুটপাতের দোকান এবং নতুন নির্মাণাধীন ভবনগুলো থেকে নিয়মিত নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে চাঁদাবাজি চলত।
শুধু সাধারণ মানুষই নয়, দলীয় প্রতিপক্ষ বা সিনিয়র নেতারাও রেহাই পাননি এই চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের হাত থেকে। গত বছরের (২০২৫) ২৫ ফেব্রুয়ারি খোদ স্থানীয় আদাবর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুম বাবুলের একটি আবাসিক বাড়ি জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা চালায় নয়ন ও জসিমের অনুসারীরা। ওই সময় বাড়িটি দখল করতে ব্যর্থ হয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে সেখানে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। সিসিটিভি ফুটেজেও হামলার সময় ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন স্থানীয় নেতাকে ঘটনাস্থলে সরাসরি উপস্থিত থাকতে দেখা গিয়েছিল।
যদিও সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে আদাবর থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মজুমদার জসিম দাবি করেছেন যে, তিনি বিরোধ মীমাংসার জন্যই কেবল সেখানে গিয়েছিলেন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাঁর ও সংগঠনের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালাচ্ছে। এদিকে গত মাসে মিরপুরের একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে রক্তক্ষয়ী হামলার ঘটনার জের ধরে ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের আওতাধীন আদাবর থানা কমিটি আগেই বিলুপ্ত করা হয়েছিল। বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক আকরাম আহমেদ দাবি করেছেন, নয়নকে আদাবরের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আটক করার কথা বলা হলেও পরে রহস্যজনকভাবে কারওয়ান বাজারের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, যা এক ধরনের চক্রান্ত।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ডিবি পুলিশের অবস্থান সম্পূর্ণ স্পষ্ট। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই নয়ন হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কারওয়ান বাজারের ঘটনার পাশাপাশি আদাবরে তার বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজি ও দখলের অন্যান্য গুরুতর অভিযোগগুলোও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্তে অন্য কারও নাম কিংবা অপরাধমূলক সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের কাউকেও ছাড় দেওয়া হবে না এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
