ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন ডানপন্থি জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর মুখে পড়েছে। নির্বাচনের পর প্রকাশিত বুথফেরত জরিপে এমন আভাস পাওয়া গেছে। তবে নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোও এককভাবে সরকার গঠনের মতো আসন পায়নি। ফলে দেশটিতে নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর দেশটির তিনটি প্রধান টেলিভিশন চ্যানেল—১১, ১২ ও ১৩-এর বুথফেরত জরিপে নেতানিয়াহুর জোট ৫০টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়। অন্যদিকে, ইহুদিদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সম্ভাব্য আসন দেখানো হয় ৫২টি। ইসরাইলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন।
তবে মঙ্গলবার রাতে ও বুধবার ভোরে প্রকাশিত হালনাগাদ জরিপে নেতানিয়াহুর অবস্থানের কিছুটা উন্নতি দেখা যায়। চ্যানেল ১২-এর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, তার জোট ৫২টি আসন পেতে পারে। বিপরীতে, ইহুদিদের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সম্ভাব্য আসন কমে দাঁড়িয়েছে ৪৯টিতে।
এদিকে, আরব নেতৃত্বাধীন দুটি দল—জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম—মিলিয়ে ১৮ থেকে ১৯টি আসন পেতে পারে বলে জরিপে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পার্লামেন্টে দল দুটির মোট আসন ১০টি। এবারের নির্বাচনে তাদের সম্ভাব্য এই সাফল্যকে উল্লেখযোগ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে বুথফেরত জরিপ চূড়ান্ত ফল নয়। ভোট গণনা শেষে আসনসংখ্যায় পরিবর্তন আসতে পারে। এ কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের জন্য অপেক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সবচেয়ে বড় দল হতে পারে লিকুদ
বুথফেরত জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৪ থেকে ২৫টি আসন পেয়ে পার্লামেন্টের বৃহত্তম দল হতে পারে। বর্তমানে দলটির আসনসংখ্যা ৩২।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের ইয়াশার পার্টি ২১ থেকে ২৩টি আসন পেতে পারে। বিরোধী দল বি’ইয়াচাদ ১২ থেকে ১৩টি আসন নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে থাকতে পারে।
এ ছাড়া জয়েন্ট লিস্ট ১১টি, বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস ৯ থেকে ১০টি এবং কট্টর ডানপন্থি ওতজমা ইয়েহুদিত ৬ থেকে ৭টি আসন পেতে পারে বলে জরিপে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
সরকার গঠনে কঠিন সমীকরণ
নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করা। আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন পেলে বিরোধী শিবিরের সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে বিরোধী জোটের চারটি ইহুদি নেতৃত্বাধীন দলের মধ্যে তিনটি নির্বাচনী প্রচারে আরব-প্রধান দলগুলোর সঙ্গে জোট না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বুথফেরত জরিপের প্রতিক্রিয়ায় ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকট বলেন, এই ফল নেতানিয়াহু এবং ৭ অক্টোবরের হামলার সময় ক্ষমতায় থাকা সরকারের প্রতি জনগণের অনাস্থার প্রতিফলন।
তিনি বলেন, চূড়ান্ত ফল একই রকম হলে তা ইসরাইলের দায়িত্বশীল জায়নবাদী সংখ্যাগরিষ্ঠের বিজয় হবে। জনগণের রায় বাস্তবায়ন এবং নেতানিয়াহুর সরকার পরিবর্তনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
তবে আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া আইজেনকটের পক্ষে সরকার গঠন কঠিন হতে পারে। ইয়িসরাইল বেইতেনু দলের নেতা আভিগদর লিবারম্যান এবং বি’ইয়াচাদ দলের নেতা নাফতালি বেনেট আরব দলগুলোর ওপর নির্ভর করে সরকার গঠন না করার অঙ্গীকার করেছেন।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা ইয়ার গোলান পরিবর্তনের সরকার গঠনে সব অংশীদারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি রা’আমের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান জানিয়েছিলেন।
আরব দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ছে
নির্বাচনে ভালো ফলের পূর্বাভাস পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো। রা’আমের নেতা মানসুর আব্বাস জানিয়েছেন, রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে দুই শিবিরের নেতারাই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
চ্যানেল ১২-কে আব্বাস বলেন, শুধু পরিবর্তনপন্থি শিবির নয়, নেতানিয়াহুর সমর্থক শিবির থেকেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।
আইজেনকটের নেতৃত্বে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও আব্বাস বলেন, এমন সরকার গঠনের বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে কি না, তা আগে স্পষ্ট হতে হবে।
অন্যদিকে, জয়েন্ট লিস্টের নির্বাচনী কার্যালয়ে সমর্থকদের উল্লাস করতে দেখা গেছে। বুথফেরত জরিপে দলটি ১০ থেকে ১১টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নেতানিয়াহু ও কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রীদের ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রত্যাশা জানিয়েছেন দলটির নেতারা।
পুনর্নির্বাচনের সম্ভাবনা
ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগকে এমন একজন প্রার্থীকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দিতে হবে, যার সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এ ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু ও আইজেনকট—দুজনই প্রেসিডেন্টের কাছে সরকার গঠনের সুযোগ চাইতে পারেন।
তবে কোনো পক্ষই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে নতুন করে নির্বাচন আয়োজনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
এর আগে ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ইসরাইল দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার মুখে পড়ে। ওই সময়ে দেশটিতে পাঁচবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
এবারের নির্বাচনে গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি দেখা গেছে। ৭৭ শতাংশের বেশি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বুথফেরত জরিপের সঙ্গে চূড়ান্ত ফলের পার্থক্য থাকতে পারে। ফলে আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত ইসরাইলের পরবর্তী সরকার কোন রাজনৈতিক সমীকরণে গঠিত হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল







