জাপানের টোকিওতে স্বাক্ষর হওয়া দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সাম্প্রতিক মেগা প্রকল্পের কাজ বণ্টনের নেপথ্যে ভারতের প্রবল ভূ-রাজনৈতিক উপস্থিতির বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে একটি বড় বিতর্ক। প্রকাশ্যে জনগণের সামনে কড়া কড়া ভারতবিরোধী স্টেটমেন্ট দিয়ে জাতীয়তাবাদী আবেগ উস্কে দেওয়া হলেও, বাস্তবে ভারতের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত রোডম্যাপ বাস্তবায়নে বিএনপি সরকার নমনীয় অবস্থান বজায় রাখছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ উঠেছে, অতীতে বন্দর ও করিডোর সুবিধার মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ যেমন ক্ষুণ্ন করা হয়েছে, ঠিক একইভাবে বর্তমানে ‘উন্নয়ন অংশীদার’ জাপানের ঋণচুক্তির আড়ালে ভারতের দিল্লি ও টোকিও অক্ষকে অস্বাভাবিক খরুচে নির্মাণ প্রকল্পের সুবিধা করে দেওয়া হচ্ছে। এতে একদিকে দেশ ঋণের ফাঁদে পড়ছে, অন্যদিকে প্রতিবেশী ভারতের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে।
এমনকি এই স্পর্শকাতর ও জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সম্পর্কিত অর্থনৈতিক চুক্তিগুলো থেকে জনদৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে রাখতে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কৃত্রিম নানা উত্তেজনা জিইয়ে রাখা হচ্ছে। গণঅধিকার পরিষদের নেতা রাশেদ খাঁনসহ বিভিন্ন বিতর্কিত রাজনৈতিক চরিত্রকে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া এবং আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে টোকিও সফরের সঙ্গী হিসেবে সামনে আনার পেছনে এই বড় চুক্তিগুলো আড়ালের সুদূরপ্রসারী রাজনীতি রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় ও বিপজ্জনক প্রতিফলন দেখা গেছে ঢাকা মেট্রোরেল লাইন-১ (প্রথম পাতাল রুট)-এর প্যাকেজ বণ্টনে। এই প্রকল্পের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্যাকেজে (CP-09 ও CP-10) প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা) কাজ একাই হস্তগত করেছে ভারতীয় বহুজাতিক সংস্থা ‘লার্সেন অ্যান্ড ট্যুব্রো’ (L&T)। হাসিনা সরকারের আমলে সিকলবাহা, ভেড়ামারা বা বিবিয়ানার মতো বিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ পেলেও, কখনোই একক প্রকল্পে এই ভারতীয় কোম্পানিটি এত বিশাল অঙ্কের চুক্তি পায়নি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ভারতে লার্সেন অ্যান্ড ট্যুব্রো কেবল একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানি নয়, বরং তারা দেশটির অন্যতম প্রধান ‘প্রাইভেট মিলিটারি কন্ট্রাক্টর’। তারা ভারতের ‘ব্রাহ্মোস’ সুপারসনিক মিসাইলের মোবাইল লঞ্চ প্ল্যাটফর্ম, পিনাকা রকেট লঞ্চার, অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড মিসাইল ও বিভিন্ন সমরাস্ত্র তৈরি করে। ভারতের জাতীয় প্রতিরক্ষার জন্য অস্ত্র তৈরি করা একটি সংস্থাকে বাংলাদেশের রাজধানীর সংবেদনশীল ‘কী পয়েন্ট ইনস্টলেশন’ (KPI) মেট্রোরেলের সিগন্যালিং, টেলিকম ও ট্র্যাক স্থাপনের একচ্ছত্র কাজ দেওয়া বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁক সৃষ্টি করছে।
লাইন-১ এর ছয়টি প্যাকেজের (CP-02 থেকে CP-10) বিস্তারিত বাজেট ও ঠিকাদার তালিকা বিশ্লেষণ করলে ভারত-জাপান অক্ষের দাপট স্পষ্ট ফুটে ওঠে। ডিপো বানানোর প্রান্তিক সিপি-০২ (CP-02) প্যাকেজের ৩৪৫ মিলিয়ন ডলারের কাজ চীনারা পেলেও, আন্ডারগ্রাউন্ড লাইন ও স্টেশনের ১.৪৩ বিলিয়ন ও ৯৩৫ মিলিয়ন ডলারের দুটি বিশাল প্যাকেজ গেছে জাপানি কোম্পানিগুলোর পকেটে। যেখানে সিপি-০৬ প্যাকেজে জাপানি কনসোর্টিয়াম সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটের চেয়ে ৩২% বেশি দাম হাঁকা সত্ত্বেও তাদেরকেই কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল নির্মাণে আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান ও বিশেষায়িত চীনা সংস্থা ‘সিআরইসি’ (CREC)-কে ভূগর্ভস্থ কোনো প্যাকেজেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আন্তর্জাতিক দরপত্রে অভিজ্ঞ চীনা কোম্পানিগুলোকে দৃশ্যত সাইডলাইনে রেখে জাপান ও ভারতের সামরিক-অর্থনৈতিক অক্ষের হাতে বাংলাদেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেলের চাবিকাঠি সঁপে দেওয়ার ঘটনাকে কৌশলগত ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা চরম উদ্বেগের চোখে দেখছেন।
