চট্টগ্রামের রাউজানে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, বালু-মাটির ব্যবসা, ইটভাটা, নদী দখল ও চাঁদা আদায়ের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এক ভয়াবহ খুনাখুনির উৎসব শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গত এক বছরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও গুলি করে অন্তত ৩৫ জনকে হত্যা করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিহত ৩৫ জনের মধ্যে ২০ জনই সরাসরি রাজনৈতিক বিরোধের বলি। তাদের মধ্যে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ভাই ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর ১০ জন অনুসারী এবং চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক গোলাম আকবর খন্দকারের ৫ জন অনুসারী রয়েছেন। আওয়ামী সরকারের পতনের পর ফজলে করিম চৌধুরীর সাম্রাজ্য ভেঙে পড়লে সেই নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কব্জায় নিতেই এই দুই প্রভাবশালী বিএনপি নেতার অনুসারীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে।
রাউজানে বর্তমানে একাধিক সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় থেকে রাজনীতি ও ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করছে। এর মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অনুসারী ‘রায়হান আলম গ্রুপ’ (নিয়ন্ত্রক গিয়াস কাদের চৌধুরী) এবং ‘আজিজ বস’-এর অনুসারী ‘ডাকাত আলম গ্রুপ’ বা ‘মেজর ইকবাল গ্রুপ’ (নিয়ন্ত্রক গোলাম আকবর খন্দকার) সরাসরি রাজনৈতিক আশ্রয়ে থেকে হত্যাকাণ্ড ও চাঁদাবাজি পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও দুই নেতাই এসব ক্যাডার বাহিনীকে অর্থ বা আশ্রয় দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।
হত্যাকাণ্ডের এই ধারাবাহিকতা শুরু হয় ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট রাউজান পৌরসভার চারা বটতল বাজারে শ্রমিক লীগ নেতা আবদুল মান্নানকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যার মাধ্যমে। এরপর উরকিরচরে নিখোঁজের চার দিন পর আজম খানের লাশ উদ্ধার এবং ১২ নভেম্বর হাফেজ মাওলানা আবু তাহেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে; ২৪ জানুয়ারি নোয়াপাড়ায় ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমকে জুমার নামাজে যাওয়ার পথে এবং ১৯ ফেব্রুয়ারি যুবলীগ কর্মী হাসানকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের মার্চে আমিরহাট বাজারে যুবদল কর্মী কমর উদ্দিন (জিতু), ২১ মার্চ পূর্ব গুজরায় রুবেল, ৪ এপ্রিল নূর আলম বকুল, ১৯ এপ্রিল বাগোয়ানে প্রবাসফেরত যুবদল কর্মী মানিক আবদুল্লাহ এবং ২২ এপ্রিল গাজীপাড়ায় চায়ের দোকানে অটোরিকশা থেকে নেমে যুবদল কর্মী ইব্রাহিমকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। ৬ জুলাই কদলপুরের ঈশান ভট্টের হাটে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদলের সদস্যসচিব মো. সেলিমকে।
রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি কর্ণফুলী নদীর বালুমহাল ও ঠিকাদারি ব্যবসার দখল নিয়ে ২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর মদুনাঘাট সেতুর কাছে খুন হন ব্যবসায়ী আবদুল হাকিম। এর ধারাবাহিকতায় ২৫ অক্টোবর যুবদল কর্মী আলমগীর আলম, ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি পূর্ব গুজরায় জানে আলম সিকদার, ২৫ ফেব্রুয়ারি অলিমিয়াহাটে আবদুল মজিদ এবং ২৬ এপ্রিল একই এলাকায় যুবদল কর্মী নাসির উদ্দিনকে হত্যা করা হয়। এমনকি চলতি বছরের ১৩ জুন পাহাড়তলী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে। সর্বশেষ ৩ সেপ্টেম্বর উরকিরচরের কেরানীহাট বাজারে খুন হন মোহাম্মদ করিম।
এই তাণ্ডবলীলা ও প্রকাশ্য খুনাখুনি নিয়ে বিএনপির দুই শীর্ষ নেতার মধ্যে চলছে চরম পাল্টাপাল্টি কাদা ছোড়াছুড়ি। গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অভিযোগ, আকবর খন্দকার আওয়ামী লীগের সাবেক সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিজ দলে ভিড়িয়ে তাঁর অনুসারীদের ওপর পরিকল্পিত হামলা চালাচ্ছেন। অন্যদিকে গোলাম আকবর খন্দকার পাল্টা তোপ দাগিয়ে বলেছেন, “অপরাধী কখনো অপরাধ স্বীকার করে না। বালু-মাটির ব্যবসা, ইটভাটা ও চাঁদাবাজির ভাগাভাগি নিয়ে গিয়াস কাদেরের ক্যাডাররাই এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।”
উল্লেখ্য, গত বছর দুটি পক্ষের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষে গোলাম আকবর খন্দকারের গাড়িবহরে হামলা ও তিনি নিজে ছররা গুলিতে আহত হওয়ার পর কেন্দ্রীয় বিএনপি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা কমিটি বিলুপ্ত করে এবং গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর দলীয় পদ স্থগিত করে। তবে পুলিশের চট্টগ্রাম জেলা সুপার মাসুদ আলম জানিয়েছেন, অপরাধীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই; রাউজানের চিহ্নিত সন্ত্রাসী রায়হানসহ সব খুনের আসামিদের ধরতে যৌথ অভিযান অব্যাহত রাখা হয়েছে।







