সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নীতিবাক্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভিডিও বানিয়ে আলোচনায় আসলেও এবার অন্ধকার জগতের চাঞ্চল্যকর তথ্য নিয়ে ফেঁসে গেছেন সাতক্ষীরার দেবহাটার আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর আবদুল্লাহ আল মামুন। এক ইউপি চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত ও অন্তরঙ্গ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবির অভিযোগে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তারকৃত মামুন দেবহাটা উপজেলার চণ্ডীপুর গ্রামের বাসিন্দা। এই চাঞ্চল্যকর ব্ল্যাকমেইল ও অর্থ আদায়ের ঘটনায় ফাঁস হওয়া একাধিক অডিও রেকর্ডিংয়ে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। যেখানে মামুনের পক্ষে অর্থের দর-কষাকষি ও সমঝোতার প্রস্তাব দিতে শোনা যায় সখিপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি ও মামলার প্রধান আসামি জিসান বাবুলকে।
মামলার বাদী ও সাতক্ষীরার নওয়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেব আলীর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, পারিবারিক বিরোধের জেরে প্রায় ছয়-সাত মাস আগে তিনি তাঁর স্ত্রীকে তালাক দেন। কিন্তু সেই তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী গোপনে তাঁদের দাম্পত্য জীবনের বেশ কিছু অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও ধারণ করে রেখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে অভিযুক্ত চক্রটি সেই গোপনীয় ডিজিটাল কনটেন্ট সংগ্রহ করে বাদীর হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে চরম ব্ল্যাকমেইল শুরু করে।
অভিযোগ রয়েছে, গত ১৫ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই ব্ল্যাকমেইলের অংশ হিসেবে প্রথমে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। পরবর্তীতে দফায় দফায় দর-কষাকষি করে সেই অংক কমিয়ে প্রথমে ৩ লাখ এবং সর্বশেষ ১ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা হয়। এমনকি বাদী ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করার পরও চক্রটি তাঁকে ব্ল্যাকমেইল করা অব্যাহত রাখে এবং আরও টাকার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকে।
ভাইরাল হওয়া অডিও ক্লিপগুলোতে ছাত্রদল নেতা জিসান বাবুলকে অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে বলতে শোনা যায়, ‘সে (মামুন) এককথায় এক লাখ টাকা চাচ্ছে। এবার কী বলব বলেন? সে তো ৫০ হাজার টাকার কথাও শুনবে না।’ অন্য একটি অডিওতে তাকে এও বলতে শোনা যায়, ‘আপনি ৫০ হাজার টাকা দেন, আমি হাত-পা ধরে হলেও আপনার ভিডিওর বিষয়টি মিটমাট করে নেব।’ ভিডিও চিরতরে মুছে দেওয়ার আশ্বাসে টাকা আদায়ের এমন বহু কথোপকথন রেকর্ড করা হয়েছে।
টাকা না পেয়ে গত ২৯ অক্টোবর ‘সখিপুর ইউনিয়ন ছাত্রদল’ নামের একটি ফেসবুক আইডি এবং পরবর্তীতে ১ নভেম্বর আবদুল্লাহ আল মামুনের ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে বাদীর আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও প্রকাশ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলে মারাত্মকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হন ওই ইউপি চেয়ারম্যান।
ভুক্তভোগী চেয়ারম্যান বাধ্য হয়ে গত ১ নভেম্বর সাতক্ষীরা সদর থানায় একটি পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় সখিপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি জিসান বাবুলকে প্রধান আসামি, কনটেন্ট ক্রিয়েটর আবদুল্লাহ আল মামুনকে দ্বিতীয় আসামি এবং বাদীর দ্বিতীয় স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস ওরফে মৌসুমীকে তৃতীয় আসামি করা হয়। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও দুই-তিনজনকে আসামি করা হয়েছে।
স্থানীয় বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ছাত্রদল নেতা জিসান বাবুলসহ স্থানীয় কিছু উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীর সঙ্গে গভীর সখ্য গড়ে তোলেন এই কনটেন্ট ক্রিয়েটর মামুন। এরপর থেকেই তারা এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে আসছিলেন। নবনির্মিত সাতক্ষীরা-মুন্সিগঞ্জ সড়কের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, কালিগঞ্জ ও দেবহাটার বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিক এবং বিত্তবানদের জিম্মি করে নিয়মিত মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায়ের বহু অভিযোগ রয়েছে এই চক্রটির বিরুদ্ধে। এর আগে পারুলিয়া এলাকার একটি ক্লিনিকেও চাঁদাবাজির সময় স্থানীয় জনতার তোপের মুখে পড়েছিলেন মামুন।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সাতক্ষীরা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) জামিল কবির জানান, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় প্রধান অভিযুক্তদের একজন আবদুল্লাহ আল মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ ও ব্ল্যাকমেইলের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে। মামলার অন্য পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে জোরালো অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে দলীয় পরিচয়ের আড়ালে এমন অপরাধের বিষয়ে দেবহাটা উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইমরান ফরহাদ বলেন, বিষয়টি তাঁদের নজরে এসেছে। দলের নাম ভাঙিয়ে কোনো ধরনের অপকর্ম বা অপরাধ বরদাশত করা হবে না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে প্রধান আসামি ছাত্রদল নেতা জিসান বাবুলের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ঝামেলার কথা বলে সংযোগ কেটে দেন এবং পরবর্তীতে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
