ভারতের কাশ্মীর, লাদাখ, নাগাল্যান্ড, মনিপুর, আসাম বা সিকিমসহ উত্তরপূর্বাঞ্চলের প্রত্যেকটি পাহাড়ি অঞ্চলেই ব্যাপক সেনা মোতায়েন রয়েছে। চীন, পাকিস্তান ও নেপাল—সব প্রতিবেশী দেশই তাদের পার্বত্য এলাকায় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সেনা ও নিরাপত্তা বল বাড়িয়েছে। বাংলাদেশেও পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য এটাই স্বাভাবিক বাস্তবতা—বিগত দশকগুলোতে বিভিন্ন সরকারের আমলে সেখানে সেনা ক্যাম্প, বিজিবি-কাফেলার মোতায়েন অব্যাহত ছিল।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন পার্শ্ববর্তী একটি কূটনৈতিক টোন বাংলাদেশের পাহাড়ে সেনা মোতায়েন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন—অন্যত্র নিজেদের নিরাপত্তা নীতিকে তারা গ্রহণযোগ্যতা দেয়ার পর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভিন্ন সুরে কথা বলা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর পাহাড়ে প্রায় পাঁচশত ক্যাম্প নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ক্যাম্পসংখ্যা অনেকটাই কমে ২৩০টিতে এসেছে। ওই পরিপ্রেক্ষিত থেকে কিছু নিরাপত্তা বিশ্লেষক মনে করেন, ক্যাম্প কমানোর পরই বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যক্রমের পুনর্জাগরণ দেখা গেছে।
তদন্ত-নির্বতিত সূত্র ও স্থানীয় নিরাপত্তা অবজার্ভেশনের আশংকা অনুযায়ী ইউপিডিএফ ও জেএসএসের মতো গ্রুপের অন্তত কিছু প্রশিক্ষণ-কেন্দ্র সীমান্ত পার্শ্ববর্তী মিজোরাম, ত্রিপুরা এলাকায় কার্যক্রম চালায় এবং সেখান থেকেই অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ পৌঁছে। সীমান্তশহরগুলোর মাধ্যমে অস্ত্র-চালান প্রবাহের দায়াভার পুরোপুরি স্থানীয় গ্রুপগুলোর কাঁধেই চাপানো যাচ্ছে না—এটি আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক ও বহিরাগত সহায়তার ছাপ রাখে বলে মত নিরাপত্তা সূত্রের।
কূটনৈতিক মঞ্চে পার্শ্ববর্তী দেশের এমন দ্বৈতপ্রধান প্রবণতা বাংলাদেশকে সতর্ক করেছে। দেশের নিরাপত্তা মহল বলছে, পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যা কেবল অভ্যন্তরীণ নন—এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ব্যালান্সের ব্যাপারও বটে। তাই বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে নিজ অবস্থান ও তথ্য-তত্ত্ব শক্তভাবে উপস্থাপন করতে হবে, পাশাপাশি সীমান্ত অমানিশা রোধে সমন্বিত প্রতিরোধ গঠন জরুরি।
স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পর্যায়ের কাছে যে কর্তব্যগুলো তুলে ধরা হচ্ছে, তাদের মধ্যে রয়েছে—পাহাড়ি অঞ্চলে উপস্থিত বাকি অস্পষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতার ওপর কড়া নজরদারি, সীমান্ত চ্যানেলে তল্লাশি জোরদার করা, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তথ্যচারণায় জোর増ানো এবং কূটনৈতিক ভাবে বিষয়টি বিশ্বের কাছে তুলে ধরে দ্বৈতনীতির বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপন করা। পাশাপাশি বিস্তৃত মনুষ্য এবং প্রযুক্তিগত উপস্থিতি বজায় রাখলে গোপন ঘাঁটি বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট পক্ষেরা সতর্ক করে বলছেন—যদি আঞ্চলিক সহায়তা থেমে না যায় এবং উসকানিমূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকে, তবে পার্বত্য অস্থিরতা শুধু পাহাড়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না; তার প্রতিক্রিয়া সমতলে এসে নাশকতা, সন্ত্রাসী সরবরাহ কিংবা সামাজিক অস্থিতিশীলতার রূপ নিতে পারে। তাই কূটনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থান নেওয়া এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা—উভয়ই সময়োপযোগী ও অপরিহার্য বলে মনে করছেন নিরাপত্তা পর্যবেক্ষকরা।
