জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ও সংসদ নির্বাচনে পিআর (সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতি নিয়ে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখনো অনৈক্য বিরাজ করছে। তবে, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে এক ধরনের ঐক্য দেখা যাচ্ছে। পিআর পদ্ধতি ও জুলাই সনদ—এই দুই ইস্যুতে বহিরাগত মতবিরোধ থাকলেও বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট দলগুলো ভোটের প্রস্তুতি গ্রহণে ব্যস্ত।
দৈনিক ইত্তেফাকের সর্বশেষ খবরের জন্য Google News অনুসরণ করুন।
ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ইতোমধ্যেই প্রার্থী বাছাই শুরু করেছে। চলতি অক্টোবরের মধ্যে প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা চূড়ান্ত করার জন্য দলটি প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার আগে সমমনা ও যুগপৎ আন্দোলনের সহযোগী দলগুলোর সঙ্গে আসন বন্টন এবং মনোনয়নের বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনা করছে বিএনপি। যদিও জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি দিয়ে নির্বাচন এবং সংসদের উভয় কক্ষে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবি নতুন করে তোলার ঘোষণা দিয়েছে আন্দোলনকারীরা, জামায়াত ইতোমধ্যেই অর্ধশতাধিক আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম প্রকাশ করেছে। প্রার্থীরা নিজ এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ চালাচ্ছেন। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানও সম্প্রতি রাজধানীর নির্বাচনী এলাকায় জুমার নামাজ শেষে স্থানীয় মুসল্লিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেছেন।
চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রতিদিনই নিজেদের আসনে ভোটের প্রচারণায় ব্যস্ত, দলীয় প্রতীক ‘হাতপাখা’ হাতে মিছিলসহ ভোট চাইছেন। মঙ্গলবার ঢাকা-৭ আসনে দলের কেন্দ্রীয় কৃষি ও শ্রম বিষয়ক সম্পাদক আলহাজ আব্দুর রহমান ভোট প্রার্থনায় অংশ নিয়েছেন। এনসিপি, ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের নেতৃত্বাধীন গণ অধিকার পরিষদ ও জোনায়েদ সাকিরের গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থীরাও নিজ নির্বাচনী এলাকায় গণসংযোগ শুরু করেছেন। এনসিপির নেতা সারজিস আলম পঞ্চগড়ে গণসংযোগ চালাচ্ছেন, আর গণসংহতি আন্দোলনের মুখপাত্র মো. ফারুক হাসান ঠাকুরগাঁওয়ে ভোট প্রার্থনায় ব্যস্ত রয়েছেন।
বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরাও দেশের বিভিন্ন এলাকায় নানা কৌশলে প্রচারণা চালাচ্ছেন; নিয়মিত গণসংযোগ, পথসভা ও সভা-সমাবেশ করছেন। রাজধানীর আসনগুলোতে পোস্টারে শুভেচ্ছা ও সালাম জানানো হচ্ছে। এবারের দুর্গাপূজায় অনুদান প্রদান ও স্থানীয় মণ্ডপে গিয়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করা হয়েছে। অন্যান্য দলগুলোর নেতারাও নির্বাচনের প্রাক্কালে মণ্ডপ পরিদর্শন করে সংখ্যালঘুদের কাছে সমর্থন বৃদ্ধির চেষ্টা চালাচ্ছেন।
অভ্যন্তরীণভাবে ভোটের প্রস্তুতি প্রায় পূর্ণ গতিতে থাকলেও, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি প্রণয়ন ও সেটির ওপর নির্বাচন আয়োজন এবং সংসদের উভয় কক্ষে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনসহ পাঁচ দফা দাবিতে মঙ্গলবার থেকে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ১২ দিনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
বাইরের মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও ভোটের প্রস্তুতিতে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশের নির্বাচনী পরিবেশ এখন চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। সব প্রার্থী, সম্ভাব্য প্রার্থী এবং জনগণ সক্রিয় জনসংযোগে লিপ্ত। গণতান্ত্রিক সংস্কারের মাধ্যমে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সকলকে অংশ নিতে হবে।
পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবিতে ছয় দলের দ্বিতীয় দফার আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পিআর পদ্ধতির মাধ্যমে স্থায়ী সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এটি ঝুলন্ত সংসদ সৃষ্টি করে, যেখানে কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের সমস্যা দেখা গেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশবাসীর মধ্যে পিআর পদ্ধতি সম্পর্কে বেশিরভাগেরই ধারণা নেই, একটি জরিপে ৫৬% মানুষ এ বিষয়ে অজ্ঞাত।’
পিআর পদ্ধতি ও জুলাই সনদ ইস্যুতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা উপলক্ষে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সংবাদ সম্মেলনে জানান, ‘এই আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারপ্রধানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে। যদি সরকারপ্রধান জামায়াতকে বৈঠকে ডাকে, সেখানে দলের যুক্তি উপস্থাপন করা হবে এবং আলোচনা মাধ্যমে নিষ্পত্তির সম্ভাবনা রয়েছে।’
এদিকে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় আগামী শনিবার বা রবিবার রাজনৈতিক দল-জোটগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসছে ঐকমত্য কমিশন। ২৭ সেপ্টেম্বর আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠকে কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, সনদ বাস্তবায়নের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে সরকারের কাছে একাধিক সুপারিশ উপস্থাপন করা হবে।
বিএনপি এখনো প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় ব্যস্ত। দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধপূর্ণ আসনগুলোতে বিরোধ মেটাতে স্থায়ী কমিটির নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গুলশানের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। বরিশাল, কুমিল্লা, রাজশাহী অঞ্চলের আসনগুলোতেও দলের শীর্ষ নেতারা প্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলছেন।
বিএনপি মিত্র ১২ দলীয় জোট নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির কাছে ১৮টি আসনে ছাড় চেয়েছে, আর সমমনা যুগপৎ আন্দোলনের জোট আটটি আসনে প্রার্থী চেয়েছে। ১২ দলীয় জোটের মুখপাত্র শাহাদাত হোসেন সেলিম জানান, ২০১৮ সালের নির্বাচনে যেসব আসনে তাদের শরিক দলগুলোকে ছাড় দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোসহ নতুন কিছু আসনও তালিকায় রয়েছে। জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের প্রধান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, ‘আমরা আমাদের তালিকা দিয়েছে, এখন বিএনপির বিবেচনার বিষয়।’
বিএনপির মিত্র দল এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল অলি আহমদ (অব.) জানিয়েছেন, তাদের দলের জন্য এখনো বিএনপি কোনো তালিকা চায়নি। তবে মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমদের নেতৃত্বে একটি সাত সদস্যের কমিটি গঠন করেছে, যা আসন নিয়ে আলোচনায় অংশ নেবে।
অন্যদিকে, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিউ ইয়র্ক সফর শেষে বৃহস্পতিবার দেশে ফিরে মিত্র দল-জোটগুলোর সঙ্গে আসন সমঝোতার আলোচনা শুরু করবেন।
