বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে হত্যার ছয় বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে শেরেবাংলা হলের কক্ষে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নির্যাতনে প্রাণ হারান তিনি। এ হত্যাকাণ্ড ছিল কেবল একটি ছাত্রহত্যা নয়, বরং ভিন্নমত দমন ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার ফ্যাসিবাদী প্রচেষ্টা।
তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদ তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বাংলাদেশ-ভারত চুক্তির সমালোচনা করেছিলেন। সেটিই তার মৃত্যুর কারণ হয়। ঘটনার রাতে ছাত্রলীগের নেতারা তাকে দোতলার ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নিয়ে যায়। সেখানে দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা ধরে ক্রিকেট স্টাম্প ও লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। একপর্যায়ে আবরার নিস্তেজ হয়ে পড়লে তার দেহ সিঁড়িতে ফেলে রেখে যায় হত্যাকারীরা। পরে মৃতদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়।
আড়িপেতে শোনা: ফ্যাসিবাদী পরিবেশ তৈরির কারিগর
আমার দেশের অনুসন্ধানে জানা যায়, আবরার হত্যার পেছনে ভূমিকা রেখেছিল বুয়েটের ফেসবুক গ্রুপ ‘আড়িপেতে শোনা’। ২০১২ সালে গঠিত এই গ্রুপটি ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলনের সময় থেকে ‘ইসলামবিদ্বেষী’ ও ‘ফ্যাসিবাদী’ রূপ নেয়। তারা ভিন্নমতাবলম্বী শিক্ষার্থীদের ‘শিবির ট্যাগ’ দিয়ে টার্গেট করে নির্যাতনের সংস্কৃতি তৈরি করে। ২০১৪ সালে তারা এমনকি ৪৪ জন শিক্ষার্থীর একটি কালো তালিকা প্রকাশ করে, যাদের মধ্যে অন্তত ১৪ জন ছাত্রলীগের হাতে নির্যাতিত হন।
বুয়েট প্রশাসন দীর্ঘদিন এ অবস্থার ব্যাপারে জেনেও ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের নীরবতা ছাত্রলীগকে আরও উসকে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত আবরারের প্রাণহানির মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ নেয়।
বিচারের অগ্রগতি
ঘটনার পর দেশজুড়ে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, এবং ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর আদালত ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। মামলাটি বর্তমানে হাইকোর্টে বিচারাধীন। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মুনতাসির আল জেমি ২০২৩ সালের আগস্টে কারাগার থেকে পালিয়ে যায়, যা মামলার অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
ফ্যাসিবাদের শিকার আবরার ফাহাদ
বুয়েট শিক্ষার্থীরা মনে করেন, আবরার ফাহাদ ছিলেন ক্যাম্পাসে গড়ে ওঠা ফ্যাসিবাদী ও ভিন্নমতবিরোধী সংস্কৃতির সবচেয়ে মর্মান্তিক শিকার। ছাত্রলীগের বর্বরতা ও প্রশাসনের নীরবতা মিলেই তৈরি করেছিল এক আতঙ্কিত পরিবেশ, যেখানে ভিন্নমত প্রকাশ মানেই ছিল মৃত্যুর ঝুঁকি।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও কর্মসূচি
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আবরার ফাহাদের স্মৃতিকে জাতীয়ভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। আজ (৭ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টায় ঢাকাসহ দেশের সব শিল্পকলা একাডেমিতে “You Failed to Kill Abrar Fahad” প্রামাণ্যচিত্রটি প্রদর্শিত হবে। ঢাকার প্রদর্শনীতে উপস্থিত থাকবেন আবরারের বাবা।
এ ছাড়া সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নতুন বার্ষিক ক্যালেন্ডারে আবরার ফাহাদের মৃত্যুবার্ষিকী (৭ অক্টোবর) এবং বিডিআর বিদ্রোহ দিবস (২৫ ফেব্রুয়ারি) “গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিন” হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
জাতির স্মৃতিতে শহীদ আবরার ফাহাদ এখন আধিপত্যবাদবিরোধী প্রতিবাদের এক অমর প্রতীক।







