বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে আধুনিকায়ন ও জাতীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে চীনের তৈরি ২০টি জে-১০ সিই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০২৭ সালের মধ্যে এই চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিচ্ছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়।
প্রায় ২৭ হাজার ৬০ কোটি টাকার এই প্রকল্পে যুদ্ধবিমান কেনা, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে। বিমানের দাম পরিশোধ করা হবে ২০৩৫-২০৩৬ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে ধাপে ধাপে।
জে-১০ সিই কেন গুরুত্বপূর্ণ
চীনের তৈরি জে-১০ সিই (J-10CE) হচ্ছে তাদের নিজস্ব বিমানবাহিনীতে ব্যবহৃত জে-১০সি মডেলের রপ্তানি সংস্করণ। এটি একটি ৪.৫ প্রজন্মের মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট, যা আকাশে যুদ্ধ, স্থল আক্রমণ এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার—সবক্ষেত্রেই সমান কার্যকর।
২০২৩ সালে পাকিস্তান এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ভারতের রাফায়েল জেট প্রতিহত করার দাবি করার পর জে-১০ সিই আন্তর্জাতিক আলোচনায় আসে। এই বিমানগুলোর উন্নত সেন্সর, রাডার ও অস্ত্র বহনের ক্ষমতা বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর যুদ্ধ সক্ষমতাকে নতুন মাত্রা দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সম্ভাব্য খরচ ও চুক্তির কাঠামো
সরকারি প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি জে-১০ সিই বিমানের সম্ভাব্য মূল্য ৬ কোটি মার্কিন ডলার, অর্থাৎ ২০টি বিমানের জন্য মোট ব্যয় হবে প্রায় ১২০ কোটি ডলার (১৪,৭৬০ কোটি টাকা)।
এছাড়া প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ মিলে আরও ৮২ কোটি ডলার (১০,০৮৬ কোটি টাকা) এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয় যুক্ত হয়ে মোট ব্যয় দাঁড়াবে ২২০ কোটি ডলার বা প্রায় ২৭,০৬০ কোটি টাকা।
চুক্তিটি সরকার থেকে সরকার (G2G) পদ্ধতিতে স্বাক্ষরিত হবে বলে জানা গেছে। এর জন্য বিমানবাহিনীর প্রধানকে সভাপতি করে ১১ সদস্যের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি দরকষাকষি, মূল্য নির্ধারণ, প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও সংরক্ষণ পদ্ধতিসহ সব শর্ত চূড়ান্ত করবে।
চীন সফরে আলোচনার সূত্রপাত
চলতি বছরের মার্চে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস চীন সফরে গেলে জে-১০ সিই ক্রয় প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। চীন প্রস্তাবটিতে ইতিবাচক মনোভাব দেখায় এবং দ্রুত বাস্তবায়নে আগ্রহ প্রকাশ করে।
বিমান বাহিনীর বর্তমান সক্ষমতা
ওয়ারপাওয়ার বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর মোট ২১২টি এয়ারক্রাফট, যার মধ্যে ৪৪টি ফাইটার জেট। এর বেশিরভাগই চীনা নির্মিত এফ-৭ মডেল। এছাড়া রয়েছে ৮টি মিগ-২৯বি, ইয়াক-১৩০, সি-১৩০জে পরিবহন বিমান এবং এমআই-১৭ হেলিকপ্টার।
নতুন জে-১০ সিই যুদ্ধবিমান সংযোজনের মাধ্যমে বিমান বাহিনী প্রথমবারের মতো ৪.৫ প্রজন্মের মাল্টিরোল ফাইটার প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করবে, যা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে বলে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও কৌশলগত গুরুত্ব
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তি বাংলাদেশ–চীন প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও ঘনিষ্ঠ করবে। একই সঙ্গে এটি দক্ষিণ এশিয়ায় সামরিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
