সাবেক জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছেন, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরেও তার বিষয়ে কোনো হালনাগাদ তথ্য নেই। যদিও একাধিক সূত্রে জানা গেছে, তিনি স্বামীসহ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন—এমন গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে দায়ের হওয়া এক হত্যা মামলার তদন্ত এখনো শেষ না হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারও আইনি পদক্ষেপ নিতে দ্বিধায় রয়েছে। এ নিয়ে স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা দিয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থান
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে শিরীন শারমিন অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। আদালতের নির্দেশনা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয় প্রস্তুত বলে জানান তারা। তবে কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিলের পর গোপনে সাধারণ পাসপোর্ট পেতে তাকে সহযোগিতা করার অভিযোগে যেসব কর্মকর্তা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধেও এখনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, কেউ কেউ বলছেন শিরীন শারমিন ঢাকাতেই আত্মীয়ের বাসায় আছেন, আবার কেউ দাবি করছেন তিনি পাসপোর্ট ছাড়াই স্থলপথে সীমান্ত পেরিয়ে গেছেন। মন্ত্রণালয় এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পায়নি।
আইন মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য
আইন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শিরীন শারমিনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা ও একটি পৃথক মামলা রয়েছে। আদালত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে, যার দায়িত্বে রয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তদন্ত শেষ হলে আদালত পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
আত্মগোপন ও পাসপোর্টের চেষ্টা
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন শাখার তথ্য অনুযায়ী, আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় শিরীন শারমিন ও তার স্বামী সাধারণ ই-পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। ধানমন্ডির একটি ঠিকানা ব্যবহার করলেও তারা অজ্ঞাত স্থান থেকে আঙুলের ছাপ ও আইরিস দেন। পরে আবেদন বাতিল করা হয়।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, তিনি ২০২৫ সালের প্রথম দিকে রাজধানীর একটি সুরক্ষিত স্থানে অবস্থান করছিলেন, তবে পরে হদিস মেলে না। অন্য এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, তিনি সম্ভবত স্থলপথে পার্শ্ববর্তী দেশে চলে গেছেন।
হত্যা মামলার অগ্রগতি
২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট রংপুর মেট্রোপলিটন আদালতে শিরীন শারমিনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন দিলরুবা আক্তার। অভিযোগে বলা হয়, শিরীন শারমিনের নির্দেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তার স্বামী মুসলিম উদ্দিনকে হত্যা করে। বাদীর দাবি, এক বছরেও তদন্তে অগ্রগতি নেই।
সিআইডির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, তদন্ত প্রক্রিয়া এগোচ্ছে এবং শিগগিরই চার্জশিট দেওয়া সম্ভব হবে, তবে এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
নোয়াখালী জেলার সন্তান ড. শিরীন শারমিন ২০০৯ সালে সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালে দেশের প্রথম নারী স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং টানা চার মেয়াদে স্পিকার ছিলেন। শেখ হাসিনার আস্থাভাজন হিসেবে তিনি সবসময় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময়ও শিরীন শারমিন সংসদ ভবনের বাসভবনে অবস্থান করছিলেন। পরে ২ সেপ্টেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান, যা তাৎক্ষণিকভাবে গৃহীত হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন দপ্তর এখনো তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত নয়। কেউ বলছেন তিনি ঢাকায় আছেন, আবার কেউ বলছেন দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। হত্যার মামলার তদন্তও এখনো শেষ হয়নি। ফলে সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বর্তমানে কোথায় আছেন—তা এখনো রহস্যাবৃত।







