২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানায় দেশের ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। বিডিআর বিদ্রোহের আড়ালে পরিচালিত ওই ঘটনায় ৫৭ জন দক্ষ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন বিডিআর হাসপাতালের মেডিকেল সহকারী নজরুল ইসলাম মল্লিক। ঘটনার পর প্রাণভয়ে তিনি হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান এবং আর চাকরিতে যোগ দেননি। পরে ছদ্মনামে আত্মগোপনে থাকলেও শেষ পর্যন্ত গুমের শিকার হন; হত্যা করে তার লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নজরুল ইসলামের স্ত্রী মুন্নী আক্তার স্বামীর হত্যার বিচার চেয়ে মামলা করেন। নজরুলসহ শতাধিক মানুষকে গুম ও হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিচার চলছে।
নজরুল হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত উঠে এসেছে তার স্ত্রী মুন্নী আক্তার ও চাচা হাবিবুর রহমান মল্লিকের বর্ণনায়। মুন্নী আক্তার জানান, ২০০৯ সালের ওই ঘটনার সময় আতঙ্কে তার স্বামী দেয়াল টপকে পালিয়ে কেরানীগঞ্জে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরে তিনি স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন স্থানে সরে যান। ২০১০ সালে তারা গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় একটি ক্লিনিকে বসবাস শুরু করেন, যেখানে নজরুল ‘নুরুল আমীন মুন্সী’ নামে কাজ করছিলেন। কিন্তু একই বছরের ১৫ মার্চ কর্মস্থলে যাওয়ার পর তিনি আর ফেরেননি।
স্বামীর নিখোঁজ হওয়ার পর মুন্নী আক্তার খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারেন, সেদিন সাদা পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি নজরুল ও তার সহকর্মী রুহুল আমীনকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। রুহুল আমীনকে নির্যাতনের পর ফেলে রাখা হলেও নজরুলকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে মুন্নী আক্তার কোটালীপাড়া থানায় অপহরণের মামলা করেন।
পরবর্তীতে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে, বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার বলেশ্বর নদী থেকে নজরুলের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পত্রিকায় প্রকাশিত ছবির মাধ্যমে তার ভাই লাশ শনাক্ত করেন। প্রথমে লাশটি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হলেও পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করে পরিবার সেটি নিজেদের কাছে নিয়ে গিয়ে দাফন করে।
নজরুলের চাচা হাবিবুর রহমান মল্লিক জানান, বিদ্রোহের দিন বিকেলে নজরুল ফোনে জানিয়েছিলেন যে, তিনি আর বিডিআরে ফিরবেন না, কারণ সাক্ষীদের হত্যা করা হচ্ছে বলে তিনি শুনেছেন। এরপর নিখোঁজ হওয়ার পর দীর্ঘ অনুসন্ধানেও তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে প্রশাসনের মাধ্যমে তার মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।
পরিবারের দাবি, গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে তারা জানতে পেরেছেন, তৎকালীন র্যাবের গোয়েন্দা প্রধান জিয়াউল আহসান নজরুল ইসলামকে হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।







