বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের। গত কয়েক মাসে একের পর এক অনিয়ম, ঘুস, নথি ফাঁস ও অসদাচরণের ঘটনায় সংস্থাটির ভাবমূর্তি তলানিতে নেমে এসেছে। কেউ ঘুস নিতে গিয়ে ধরা পড়ছেন, কেউ অর্থের বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় গোপন বা ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করছেন। কেউবা নিয়ম ভেঙে বিদেশ সফরে যাচ্ছেন বা ট্রাফিক পুলিশকে গালিগালাজ করে চাকরি হারাচ্ছেন। এমনকি প্রায় দেড় শতাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও উঠেছে।
গত এপ্রিলে এনবিআর বিলুপ্ত করে ‘রাজস্ব নীতি’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা’ নামে দুটি নতুন বিভাগ গঠনের অধ্যাদেশ জারি হলে সংস্থাটিতে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। অধ্যাদেশ বাতিল ও চেয়ারম্যানের অপসারণ দাবিতে কর্মকর্তারা ধর্মঘট, কলমবিরতি, এমনকি “মার্চ টু এনবিআর” কর্মসূচিও পালন করেন। বাজেট প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায়ের গুরুত্বপূর্ণ সময়েও তারা কার্যত অফিস অচল করে দেন।
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে আলোচিত ‘ছাগলকাণ্ডে’ জড়িত মতিউর রহমানও ছিলেন এনবিআরের কর্মকর্তা। কয়েকশ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগে তিনি ও তার স্ত্রী বর্তমানে দুদকের মামলায় কারাগারে রয়েছেন।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও একের পর এক কর্মকর্তা জড়াচ্ছেন অনিয়মে। অক্টোবরের শুরুতে এনবিআর সদস্য বেলাল হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে দুদক। এর পর তাকে পদ থেকে সরিয়ে ওএসডি করা হয়। বেলালের বিরুদ্ধে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বিদেশ সফর এবং প্রশিক্ষণকালে অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণের অভিযোগও ওঠে।
৭ অক্টোবর ঘুসের অভিযোগে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের রাজস্ব কর্মকর্তা শামীমা আক্তারকে গ্রেপ্তার করে দুদক। পরদিনই এনবিআর চেয়ারম্যানের আয়কর নথি ফাঁসের ঘটনায় মামলা হয়। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য আলোচনার গোপন নথি ফাঁসের অভিযোগে দ্বিতীয় সচিব মুকিতুল হাসানকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।
৩৮ লাখ টাকা ঘুস নিয়ে এসএ গ্রুপের চেয়ারম্যানের কর-নথি হস্তান্তরের দায়ে সহকারী কর কমিশনার জান্নাতুল ফেরদৌস মিতু চাকরি হারিয়েছেন। সেপ্টেম্বর মাসে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে হাতেনাতে ধরা পড়েন রাজস্ব কর্মকর্তা রাজীব রায় ও তার সহযোগী।
অসদাচরণের দায়ে গত আগস্টে ট্রাফিক পুলিশকে গালিগালাজ করায় বরখাস্ত হন সহকারী কর কমিশনার ফাতেমা বেগম। এছাড়া এনবিআর বিলুপ্তি ইস্যুতে আন্দোলনে ভূমিকার কারণে তিন সদস্য ও এক কমিশনারকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয় এবং আরও ২১ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
একজন এনবিআর সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে সংস্থার ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু অসাধু কর্মকর্তার জন্য সবাই সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।”
অন্যদিকে এক কমিশনারের মন্তব্য, “এখন এমন অবস্থা হয়েছে— এনবিআরে কাজ করি, এটা বলাটাই লজ্জাজনক মনে হয়। টাকা ছাড়া কেউ কাজ করতে চান না। কেউ ধরা পড়ছেন, কেউ ধরা পড়ছেন না— এটাই পার্থক্য।”
দুর্নীতি রোধে অনলাইনভিত্তিক কর ও ভ্যাট ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। কর্মকর্তারা মনে করছেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ঘুস ও অনিয়ম অনেকাংশে হ্রাস পাবে এবং ব্যবসায়ীদের হয়রানিও কমবে।







