২০২৬ শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক পাঠ্যবইয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে, যেখানে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলের অনিয়ম, দুর্নীতি, কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। নতুন এসব কনটেন্ট ৬ষ্ঠ থেকে নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘স্বাধীন বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থান’ অধ্যায়ে সংযোজন করা হয়েছে। অষ্টম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য কণিকা বই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ। এনসিটিবি বলছে, বিভিন্ন শ্রেণির বইতে আরও বেশ কিছু কনটেন্ট সংশোধন করা হয়েছে।
নতুন বইয়ে কী থাকছে
নবম-দশম শ্রেণির বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে—
২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার স্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকতে চাওয়ার প্রবণতা থেকে ক্রমে কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে। বিরোধী মত দমনে অভিযানে নামে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করে দলীয় প্রভাব বিস্তার করে।
২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে আওয়ামী লীগ নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি করে। পরপর ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট পূরণ, এবং ২০২৪ সালের প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতায় থাকার রোডম্যাপ প্রণয়ন করে—যা জনগণ প্রত্যাখ্যান করে।
পাঠ্যবইয়ে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের ফলে অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অভ্যুত্থান-পরবর্তী কমিশনের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৬ বছরে বছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ সম্পদ বিদেশে পাচার হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয়, একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী ‘চোরতন্ত্র’ কায়েম করেছিল; রাষ্ট্রের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
ইতিহাসের ধারাবাহিকতা
নতুন অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে—
- ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব সরকারের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাকশাল প্রতিষ্ঠা
- ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরায় চালু
- এরশাদ শাসনের স্বৈরাচারী শাসন, দুর্নীতি ও ছাত্র-জনতার আন্দোলন
- ১৯৯০ সালে এরশাদ পতন এবং ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ
- ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণজাগরণ, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ
- ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: পাঠ্যবইয়ের বর্ণনা
২০২৪ সালে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে ছাত্রলীগের হামলা, পরে রংপুর ও চট্টগ্রামে শিক্ষার্থী হত্যার পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। অতি বলপ্রয়োগে শত শত ছাত্র-জনতা শহীদ হয়। সরকার যত শক্তি প্রয়োগ করে, আন্দোলন তত বিস্তৃত হয়।
এর ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটে এবং শেখ হাসিনাসহ সহযোগীরা ভারতে পালিয়ে যায়।
বইয়ে বলা হয়েছে—
- এই আন্দোলনে নারীদের ব্যাপক নেতৃত্ব ভবিষ্যতের সমাজে স্থায়ী প্রভাব ফেলবে
- গ্রাফিতি ও দেওয়ালচিত্রে জাতির মানবিক ও ন্যায়বোধ প্রতিফলিত হয়েছে
- এই গণ-প্রতিরোধ প্রমাণ করেছে, নিপীড়ক শাসনের পতন অনিবার্য
কনটেন্ট পরিবর্তন নিয়ে এনসিটিবির বক্তব্য
এনসিটিবির শিক্ষা ও সম্পাদনা শাখার প্রধান সম্পাদক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর জানিয়েছেন, বিভিন্ন শ্রেণির বইয়ের কনটেন্টে পরিবর্তন আসছে। ৭ মার্চের ভাষণ অষ্টম শ্রেণির বই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থান ও বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক ঘটনাগুলো সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
নতুন কনটেন্টগুলো আগামী বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে যাবে।







