২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সংঘটিত পিলখানা হত্যাকাণ্ড কি অবশ্যম্ভাবী ছিল, নাকি সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নিলে তা প্রতিহত করা সম্ভব হতো—এই প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশের পর। প্রতিবেদনে হত্যাকাণ্ডের সময় র্যাবের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার শুরুতেই র্যাবের অগ্রবর্তী ইউনিটগুলো প্রস্তুত অবস্থানে থাকলেও তাদের পিলখানায় প্রবেশ কিংবা গুলি চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়নি। কার নির্দেশে সেই অনুমতি আটকে রাখা হয়েছিল এবং সময়মতো সিদ্ধান্ত নিলে কীভাবে হত্যাকাণ্ড এড়ানো সম্ভব ছিল—এসব বিষয় উঠে এসেছে কমিশনের অনুসন্ধানে। পিলখানা বিদ্রোহ তদন্তে গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গত ৩০ নভেম্বর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদনটি জমা দেয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, র্যাবের অগ্রগামী দলগুলো সময়মতো অভিযান পরিচালনা করলে বিডিআর সদস্যদের হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হতো না। তবে তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক হাসান মাহমুদ খন্দকার ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক মেজর জেনারেল রেজানুর খান পিলখানায় প্রবেশ বা গুলি চালানোর অনুমতি দেননি। যদিও এ বিষয়ে রেজানুর খান তৎকালীন মেজর জেনারেল তারেক সিদ্দিক এবং মেজর জেনারেল জয়নুল আবেদীনকে (তৎকালীন ডিজি, এসএসএফ) দায়ী করেছেন। কমিশনের মতে, অনুমতির অপেক্ষা না করে আইন অনুযায়ী র্যাব যদি ব্যবস্থা নিত, তাহলে হত্যাকাণ্ড ঘটত না।
প্রতিবেদনের বর্ণনায় বলা হয়, ঘটনার শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই সকাল সোয়া ১০টার দিকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামসুজ্জামানের নেতৃত্বে র্যাব-২-এর একটি দল সাতটি এসএমজি নিয়ে পিলখানার চার নম্বর গেটের কাছে পৌঁছায়। সে সময় সেখানে মাত্র দুই-তিনজন বিডিআর সদস্য অবস্থান করছিলেন এবং তখনো হত্যাকাণ্ড শুরু হয়নি।
সকাল ১০টার পরপরই র্যাব-২-এর দুটি প্লাটুন নিয়ে মেজর আমিন পিলখানার পাঁচ নম্বর গেটে অবস্থান নেন। তবে ওই দুটি দলকেও ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়, পাঁচ নম্বর গেট থেকে দরবার হলের দূরত্ব ছিল আনুমানিক মাত্র ৫০ গজ।
কমিশনের মতে, ওই দুটি দল অনুমতি পেলে বা অনুমতির অপেক্ষা না করে ভেতরে প্রবেশ করলে সকাল ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে শুরু হওয়া নৃশংস হত্যাকাণ্ড যেমন রোধ করা যেত, তেমনি পরবর্তী সময় দরবার হলের পেছনে লুকিয়ে থাকা সেনা কর্মকর্তাদের হত্যাও প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো। বেলা পৌনে ১১টার দিকে পাঁচ নম্বর গেটের কাছে অবস্থানরত র্যাব সদস্যরা নিকটবর্তী একটি ভবনের ছাদ থেকে দরবার হলের সামনে পড়ে থাকা লাশ দেখতে পান, যা বাইরে থেকে দৃশ্যমান প্রথম লাশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি মেজর জেনারেল রেজানুর খান একই পোশাকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন যমুনায় অবস্থান করেন এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে তাকে যমুনা ত্যাগের অনুমতি দেওয়া হয়। অন্যদিকে, সকাল সোয়া ১০টার দিকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল জাকিরের নেতৃত্বে র্যাব-৩-এর একটি দল পিলখানার তিন নম্বর গেটে পৌঁছায়।
কমিশনের মতে, তারা বিলম্ব না করে অভিযান শুরু করলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। তবে বিডিআর সদস্যদের হামলার মুখে পড়লেও র্যাব-৩ পাল্টা গুলিবর্ষণ করেনি। র্যাব-৩-এর অধিনায়ক জানান, প্রথমে তাকে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে দরবার হলের সীমানা প্রাচীর ভেঙে ভেতরে প্রবেশের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অবস্থানে পৌঁছানোর পরই আক্রমণ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। পরে সেনাবাহিনী আসার পর আর্টিলারি রেজিমেন্টের অধিনায়ক লে. কর্নেল জিয়া তাকে পেছনে সরে যেতে নির্দেশ দেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, র্যাব-৩-এর অধিনায়ককে অবহিত না করেই তাদের একটি ফাইটিং কোম্পানিকে কর্নেল রেজানুর খান যমুনায় মোতায়েনের নির্দেশ দেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি ডিজি র্যাব তাকে জানান, পরদিন পিলখানার দিকে একটি মিছিল যেতে পারে এবং তা যেন কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়। তবে পেছনে সরে যাওয়ার কারণে ওই মিছিল আদৌ হয়েছিল কি না, তা জানা যায়নি।
২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও র্যাব কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রতিবেদনে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। বলা হয়, বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত সেনা কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের জীবন, সম্মান ও সম্পদ রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং রাজনৈতিক সমাধানের নামে চলমান প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেন।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, হত্যাকাণ্ডের স্থান যথাযথভাবে ঘিরে না রেখে অপরাধীদের বিভিন্ন যানবাহনে করে পিলখানা ত্যাগের সুযোগ দেওয়া হয়। বিদ্রোহীদের দাবিতে পুলিশকে পেছনে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং তথাকথিত ‘সাধারণ ক্ষমা’র অজুহাতে অনেক পলাতক বিডিআর সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়নি কিংবা তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এই অভিযোগের আওতায় রমনা, লালবাগ ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের ডিসি ও এডিসি, একাধিক থানার ওসি ও তদন্ত কর্মকর্তাসহ র্যাব-২-এর অধিনায়ক, উপ-অধিনায়ক, কোম্পানি কমান্ডার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্যান্য কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।







