বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ নেতাসহ উপদেষ্টাদের নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ সময় তিনি বলেন, জুলাই শহীদদের রক্ত তাজা থাকতেই এই জাদুঘর নির্মাণ সম্ভব হয়েছে, যা বিশ্বে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে যেন আর কোথাও এমন জাদুঘর নির্মাণের প্রয়োজন না পড়ে।
মঙ্গলবার বিকেলে প্রধান উপদেষ্টা জাদুঘরে পৌঁছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি, শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলের দমন-পীড়নের চিত্র এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপস্থাপনা ঘুরে দেখেন।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, পরিদর্শনকালে তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকের এখানে এসে অন্তত একটি দিন কাটানো উচিত। শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে এই জাদুঘর পরিদর্শন করলে তারা জানতে পারবে, কী ভয়াবহ নৃশংসতার মধ্য দিয়ে জাতিকে অতিক্রম করতে হয়েছে। জাদুঘরে নির্মিত আয়নাঘরগুলোতে কিছু সময় বা প্রয়োজনে একদিন অবস্থান করার সুযোগ রাখার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, আয়নাঘরে বসে দর্শনার্থীরা বন্দিদের ওপর চালানো নৃশংসতা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন। এ ধরনের বর্বরতা যেন আর কখনো না ঘটে—এই উপলব্ধিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। জাতি যেন আর কখনো সেই অন্ধকার দিনে ফিরে না যায়, এটাই আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার হওয়া উচিত।
ড. ইউনূস আরও বলেন, তরুণ ও শিক্ষার্থীরাই নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রথম দাঁড়িয়েছিল। তাদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, তবু তারা সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। সাধারণ মানুষের সেই নির্ভীকতা ও সাহস জাতির জন্য বড় শিক্ষা।
জাদুঘর নির্মাণে যুক্ত সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান প্রধান উপদেষ্টা। এ সময় সংস্কৃতি উপদেষ্টা বলেন, অল্প সময়ে জাদুঘরের কাজ এই পর্যায়ে পৌঁছানো একটি রেকর্ড। অনেক তরুণ আট মাস ধরে বিনা পারিশ্রমিকে নিরলসভাবে কাজ করেছেন, যা প্রশংসনীয়।
তিনি জানান, আরও কিছু সেকশনের কাজ শিগগিরই শেষ হবে এবং নির্বাচনের আগেই জাদুঘরটি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে। জুলাই স্মৃতি জাদুঘর বাংলাদেশের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থাকবে এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক আলোচনা, শিক্ষা, গবেষণা ও শিল্প-সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা। উপদেষ্টাদের মধ্যে ছিলেন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এ ছাড়া গুমের শিকার পরিবারের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা তুলি, গুম থেকে ফেরত ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান, জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও হাসনাত আব্দুল্লাহও উপস্থিত ছিলেন।
সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নেতৃত্বে জাদুঘরের কিউরেটর ও গবেষকরা অতিথিদের পুরো জাদুঘর ঘুরিয়ে দেখান।
এখানে অভ্যুত্থানের আলোকচিত্র, স্মৃতিচিহ্ন, শহীদদের পোশাক, চিঠিপত্র, গুরুত্বপূর্ণ দলিল, পত্রিকার কাটিং, অডিও-ভিডিও উপকরণ সংরক্ষণ করা হয়েছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের দৃশ্যও জাদুঘরে স্থান পেয়েছে।
পরিদর্শন শেষে প্রধান উপদেষ্টা ১৫ মিনিটের একটি প্রামাণ্যচিত্র দেখেন, যেখানে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন এবং চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত গণহত্যার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণ করেছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়।







