চট্টগ্রাম নগর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ঘেঁষা সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযান চালাতে গিয়ে র্যাবের ডিএডি আব্দুল মোতালেব (৪৫) নৃশংস গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। একই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন র্যাবের আরও দুই সদস্য ও একজন সোর্স। ঘটনাটি ঘটে গত ১৯ জানুয়ারি বিকেলে।
দীর্ঘদিন ধরে ‘ছিন্নমূল জনপদ’ হিসেবে পরিচিত জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্যের অভিযোগ রয়েছে। র্যাব–৭–এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর ওই এলাকায় সশস্ত্র তৎপরতা আরও বেড়েছে। দুই মাস ধরে সেখানে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা চলছিল।
র্যাব সূত্র জানায়, ঘটনার দিন সকালে একটি সোর্সের মাধ্যমে তথ্য আসে যে, জঙ্গল সলিমপুরে একটি কার্যালয় উদ্বোধন হবে, যেখানে উপস্থিত থাকার কথা ছিল তিনজন আলোচিত সন্ত্রাসীর। তাদের একজন ইয়াছিন। বিকেল তিনটার দিকে র্যাব–৭–এর ১৬ সদস্যের একটি দল এলাকায় পৌঁছায়। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে চারজন সদস্য কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করলে ইয়াছিনসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের পরপরই সেখানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কার্যালয়ের ভেতরে থাকা দেড় শতাধিক লোক প্রথমে ধাক্কাধাক্কি শুরু করে। একপর্যায়ে লাঠি, সোঁটা ও ইটপাটকেল নিয়ে র্যাব সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয়। বাইরে থাকা র্যাব সদস্যরা ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে মাইকে ঘোষণা দিয়ে আরও লোক ডেকে আনা হয়। তখন হামলাকারীর সংখ্যা তিন শতাধিক ছাড়িয়ে যায়।
ঘটনাস্থলে থাকা র্যাব সদস্যদের বর্ণনা ও পাওয়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ডিএডি আব্দুল মোতালেবকে একটি ঘরের ভেতর ফেলে অন্তত ৮–১০ জন একযোগে লাঠি দিয়ে মারধর করে। তাঁর পোশাক ছিঁড়ে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন চালানো হয়। প্রথম দিকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও ধারাবাহিক আঘাতে তিনি বারবার মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে মাথা লক্ষ্য করে বারবার আঘাত করা হয়। মেঝে ও দেয়ালে রক্তের বড় বড় দাগ দেখা যায়।
প্রথম দফা হামলার পর মোতালেবসহ চারজনকে একটি সিএনজি অটোরিকশায় তুলে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের নিজামপুর এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আরেকটি ঘরে দ্বিতীয় দফায় পিটুনি শুরু হয়। এ দফায় ১৫ থেকে ২০ জন মিলে তাঁদের ওপর হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, দ্বিতীয় দফার শেষ দিকে মোতালেব আর কথা বলতে পারছিলেন না, শুধু শ্বাস নিচ্ছিলেন। একপর্যায়ে তাঁর শরীরে আর কোনো নড়াচড়া দেখা যায়নি।
একই ঘরে থাকা র্যাবের নায়েক আরিফুল ও নায়েক এমাম হোসেনকেও দীর্ঘ সময় ধরে মারধর করা হয়। তাঁদের মাথা, পিঠ, হাঁটু ও হাতে গভীর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। হামলার পুরো সময়জুড়ে হামলাকারীরা গালাগাল করতে থাকে এবং কয়েকজন মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে। হামলার শেষে কয়েকজন নিজেরাই আহত র্যাব সদস্যদের মাথায় ব্যান্ডেজ জড়ানোর চেষ্টা করে।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহিনুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে পুলিশ নিজামপুর এলাকা থেকে চারজন র্যাব সদস্যকে উদ্ধার করে। তাঁদের শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থল ও উদ্ধারকৃতদের শরীরে গুলির কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।







