ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় বন্যার পানিতে পাকা ধান তলিয়ে যেতে দেখে জমিতেই অচেতন হয়ে মারা যাওয়া কৃষক আহাদ মিয়া (৫৫)-এর পরিবার এখন চরম দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছে। ঋণের বোঝা, তিন সন্তানের লালন-পালন এবং অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ, সব মিলিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তাঁর দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী খুসনাহার বেগম।
আহাদ মিয়া উপজেলার গোয়ালনগর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের রামপুর গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর তিন সন্তানই অপ্রাপ্তবয়স্ক, বড় ছেলে শাহাজুল (৭) প্রথম শ্রেণিতে পড়ে, মেজ ছেলে লিটন (৬) শিশুশ্রেণির শিক্ষার্থী এবং ছোট মেয়ে নুসরাতের বয়স মাত্র তিন বছর। এরই মধ্যে আরও একটি সন্তান গর্ভে, যা খুসনাহারের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পরিবারটি পৈতৃক এক শতক জমির ওপর নির্মিত একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরে বসবাস করত। কৃষিকাজের পাশাপাশি আহাদ মিয়া গ্রাম থেকে পুরোনো কাপড় সংগ্রহ করে বিভিন্ন এলাকায় ফেরি করে বিক্রি করতেন। এ আয়ের ওপরই নির্ভর করত পুরো সংসার।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাড়ির পাশের মেদির হাওরে তাঁর এক বিঘা জমি ছিল, যার ধানেই সারা বছরের খাদ্যচাহিদা পূরণ হতো। উন্নতির আশায় এ বছর তিনি অগ্রিম অর্থ দিয়ে আরও পাঁচ বিঘা জমি বর্গা নিয়ে বোরো আবাদ করেন। এ জন্য স্থানীয়ভাবে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ঋণও নেন। পরিকল্পনা ছিল, ফসল ঘরে তুলেই ঋণ শোধ করবেন। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে ছয় বিঘা জমির পাকা ধান তলিয়ে যায়।
গত শনিবার সকালে শ্রমিক নিয়ে জমিতে গিয়ে কোমরসমান পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজের ফসল ডুবে যেতে দেখে আহাদ মিয়া মানসিক আঘাতে অচেতন হয়ে পড়েন। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরে স্থানীয়রা মরদেহ উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসে এবং রাতেই জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের সব স্বপ্নও যেন ভেঙে পড়েছে।
খুসনাহার বেগম বলেন, স্বামীর রেখে যাওয়া ঋণ পরিশোধ করার কোনো সামর্থ্য তাঁর নেই। এখন সন্তানদের নিয়ে কীভাবে বেঁচে থাকবেন, সে দুশ্চিন্তায় তিনি দিশেহারা। স্বজনদের আর্থিক অবস্থাও দুর্বল হওয়ায় সেখান থেকেও তেমন সহায়তা পাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি সরকারি সহায়তার জন্য আকুতি জানিয়েছেন।
রোববার বিকেলে স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও কৃষি কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের প্রতিনিধিরা আহাদের পরিবারকে দেখতে যান। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনা খাবার, নতুন পোশাক ও কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
আহাদের বড় ভাই আহম্মদ হোসেন জানান, তাঁর ভাই কাপড় ফেরি করে সংসার চালাতেন এবং ঋণ নিয়ে জমি চাষ করেছিলেন। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে তিনি কাপড় বিক্রি করতেন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, নাসিরনগরে প্রায় ১৭ হাজার ৯৮২ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে, যেখানে প্রায় ৫৫ হাজার কৃষক যুক্ত। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা পাঠানোর নির্দেশনা এলেও এখনো সব কৃষকের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। বর্তমানে প্রায় ৩০৫ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আহাদ মিয়ার স্ত্রীকে বিধবা ভাতা ও গর্ভকালীন ভাতার আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি তাঁর পরিবারের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও পাঠানো হয়েছে, সেখান থেকেও সহায়তা পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।







