বাংলাদেশে গণমাধ্যমকে ঘিরে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের একটি বহুল পরিচিত পত্রিকাকে ‘প্রথম কালো’ বলে ব্যঙ্গ করার প্রবণতা যে মাত্রা পেয়েছে, তা নিছক সোশ্যাল মিডিয়ার মামুলি ট্রল বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং এটি যে দেশের একটি বড় অংশের মানুষের মনে জমে থাকা তীব্র ক্ষোভ আর অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ—এমন ধারণা ক্রমশই জোরালো হচ্ছে।
জনমনে পুঞ্জীভূত এই অসন্তোষের পেছনে বেশ কিছু কারণ কাজ করছে। প্রথমত, সম্পাদকীয় অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন। সমালোচকদের একটি বড় অংশের অভিযোগ—গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুগুলোতে প্রথম আলোর দৃষ্টিভঙ্গি অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ বা ভারসাম্যপূর্ণ তো থাকেই না, বরং পার্শ্ববর্তী উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র ভারতের হেজিমনি তথা আধিপত্যবাদ বাস্তবায়নের এজেন্ডা সেখানে স্পষ্ট। বিশেষ করে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় সংবেদনশীল বিষয়ে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় অবস্থান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও নিরপেক্ষতাকে পাশ কাটিয়ে প্রথম আলোর শব্দচয়ন ও উপস্থাপনা বরাবরই পাঠকের কাছে পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে উক্ত উগ্র হিন্দুত্ববাদী প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ঠিক করে দেয়া উদ্দেশ্যমূলক ট্যাগিং এবং ন্যারেটিভ তথা বয়ান তৈরির অন্ধ প্রচেষ্টার কারণে জনমনে সৃষ্ট এই ধারণা ধীরে ধীরে আস্থার সংকটে রূপ নিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা নিয়ে বিতর্ক। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত কিছু লেখা বা উপস্থাপনা ঘিরে সামাজিক ও ধর্মীয় মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিশেষ করে ইসলামবিদ্বেষী মনোভাবের উগ্রপ্রকাশ এবং হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব বিস্তার করার ক্ষেত্রে প্রথম আলোর অবস্থান কখনোই দেশের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের পক্ষে ছিল না। সমালোচকদের মতে, এসব ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসকে আঘাত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না প্রথম আলো। যদিও জনরোষে বেকায়দায় পড়ার পর প্রতিবারই ব্যাখ্যা বা সংশোধনের চেষ্টা দেখা গেছে, তবুও বিতর্ক থামেনি—বরং নতুন করে আলোচনা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
তৃতীয়ত, প্রথম আলোর আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ইস্যু কাভারেজ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পাঠকের ধারণা, প্রতিবেশী দেশ বা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক বাস্তবতায় রিপোর্টিংয়ের ধরন কখনোই সমান মানদণ্ডে হয় না।
চতুর্থত, একটা সময় ছিল যখন প্রথম আলো তাদের ছাপানো পত্রিকা দিয়ে নিজেদের ইচ্ছামতো বয়ান তৈরির এই নোংরা কার্যকলাপ করতে পারতো। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের উপস্থিতি বাড়ায় সাম্প্রতিক সময়ে বেকায়দায় পড়েছে কথিত ‘প্রথম কালো’ আর তাদের দোসররা। ফলে সাংবাদিকতার আড়ালে থাকা প্রথম আলোর অপসংবাদিকতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় জনগণের প্রতিক্রিয়া বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। প্রথম আলোর কোনো একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই অনলাইনে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, যা খুব দ্রুত ব্যঙ্গ, ট্রল এবং আক্রমণাত্মক ভাষায় রূপ নেয়। ‘প্রথম কালো’ নামটি সেই ডিজিটাল প্রতিক্রিয়ারই প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পত্রিকাটির প্রধান কার্যালয়কে ঘিরে সহিংস ঘটনার খবরও আলোচনাকে আরও তীব্র করেছে। অনেকেই এটিকে হঠাৎ ক্ষোভ নয়, বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। তবে কোনো সহিংস প্রতিক্রিয়া নিজে থেকে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ না করলেও এটি দেখায় যে, গণমানুষের সঙ্গে সংবাদ মাধ্যমটির দূরত্ব কতটা বেড়ে গেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ‘প্রথম কালো’ বলে ট্রল করার পেছনে একক কোনো কারণ নয়, বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা আমলনামাই দায়ী। এগুলো সময়ের সঙ্গে দিল্লির সেবাদাসে পরিণত হওয়া প্রথম আলোর জনবিরোধী, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সাথে সাংঘর্ষিক বিতর্কিত অবস্থান, জনআস্থার সংকট সৃষ্টি এবং ডিজিটাল যুগে নিজেদের অপকর্ম আড়াল করতে না পারায় জন্ম নেয়া তীব্র প্রতিক্রিয়ার সম্মিলিত ফল।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা থেকে যায়—এই সমালোচনা কি প্রথম আলোর জন্য আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি করবে, নাকি জনগণের সাথে আরও দূরত্ব বাড়াবে? গণমাধ্যমের দায়িত্ব সঠিক তথ্য ও সংবেদনশীল উপস্থাপনা নিশ্চিত করা। যখন এটি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় তখনই কেবল একটি সংবাদমাধ্যম গণমাধ্যম হয়ে ওঠে। প্রথম আলো কখনোই তার নৈতিক অবস্থান থেকে গণমাধ্যম হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে জনগণ একে ‘প্রথম কালো’ বলে আখ্যায়িত করে নিজেদের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে মাত্র। এক্ষেত্রে অতীব জরুরি ও সত্য কথা হচ্ছে যে, আস্থা ভেঙে গেলে জনরোষ থেকে বাঁচার পথ থাকে না।







