রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে ১৩ নম্বর সেকশন পর্যন্ত সড়ক ও ফুটপাতজুড়ে গড়ে উঠেছে শত শত অবৈধ দোকান। আশপাশে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও সড়ক, গলি ও ফুটপাত দখল করে বসানো হয়েছে দোকানের সারি। পুরো এলাকাজুড়ে যেন অঘোষিত বাজারের চিত্র।
সড়ক ও ফুটপাত সিটি করপোরেশনের হলেও এসব দোকান থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলেন স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতা-কর্মী ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের সামনেই প্রতিদিন দোকান বসছে এবং প্রকাশ্যেই চাঁদাবাজি চলছে। অথচ উচ্ছেদ অভিযান বা কার্যকর ব্যবস্থা খুব একটা দেখা যায় না।
গত মার্চে রাজধানীর চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) একটি তালিকা প্রস্তুত করে। থানা-পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), বিশেষ শাখা (এসবি) ও ডিএমপি কমিশনারের গোয়েন্দা ইউনিটের সমন্বয়ে তৈরি ওই তালিকায় চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত হিসেবে ১ হাজার ২৮০ জনের নাম রয়েছে। এছাড়া আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ৩১৪ জনকে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তালিকায় নিয়মিত নতুন নাম যুক্ত হচ্ছে।
পুলিশের ওই বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, চাঁদাবাজির সুযোগ করে দিয়ে পুলিশের কিছু সদস্যও অর্থের ভাগ পেয়ে থাকেন।
রাজধানীতে দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন খাতে চাঁদাবাজি চলে আসছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এ কাজে দলটির নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণও হাতবদল হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
পুলিশের তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের বড় অংশই বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মী অথবা নিজেদের বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে পরিচয় দেন। পাশাপাশি পেশাদার সন্ত্রাসী এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কিছু কর্মীর নামও তালিকায় রয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেছেন, চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য ও সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু মিরপুর অঞ্চলের সাতটি থানা এলাকাতেই দেড় শতাধিক চাঁদাবাজির স্পট রয়েছে। এসব এলাকায় চাঁদা তোলার সঙ্গে জড়িত ৭২ জন এবং তাঁদের আশ্রয়দাতা হিসেবে ২৫ জনের নাম পাওয়া গেছে।
গাবতলী টার্মিনাল ছাড়াও ফুটপাতের দোকান, অবৈধ বাস-ট্রাক পার্কিং, অটোরিকশার গ্যারেজ, লেগুনাস্ট্যান্ড, ভাঙারির দোকান, ইন্টারনেট ব্যবসা, ময়লার ব্যবসা, ঝুট ব্যবসা, ভবন নির্মাণ, সরকারি জমিতে কাঁচাবাজার, বস্তি ও অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগসহ বিভিন্ন খাত থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলা হয়।
মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় কথা হয় কয়েকজন হকারের সঙ্গে। তাঁদের ভাষ্য, দোকানের অবস্থান ও আকার অনুযায়ী প্রতিদিন ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। সাধারণত বিকেল বা সন্ধ্যায় ‘লাইনম্যান’ পরিচয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তি এসে টাকা সংগ্রহ করেন।
মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পোশাকের দোকান চালানো এক হকার জানান, তাঁর দোকানে দুটি বৈদ্যুতিক বাতি থাকায় শুধু বাতির জন্যই দৈনিক ১০০ টাকা দিতে হয়। এছাড়া দোকান বসানোর জন্য আরও ১০০ টাকা দিতে হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন মোট ২০০ টাকা চাঁদা গুনতে হয় তাঁকে।
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি উচ্ছেদ অভিযানের কারণে সাত দিন দোকান বসাতে না পারলেও পরে সেই সাত দিনের টাকাও দিতে হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এসব ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলেন তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী আব্বাস আলী, তাঁর সহযোগী মো. তাজ ও মো. সোহেল ওরফে ভাগনে সোহেল, মিরপুর থানা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রাকিবুল হাসান সোহেল এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মী জুয়েল ও বাবুল।
ডিএমপির তালিকা বলছে, মিরপুর ১০ থেকে ১৩ নম্বর সেকশন পর্যন্ত এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ দোকান রয়েছে। প্রতিটি দোকান থেকে দৈনিক গড়ে ২০০ টাকা করে আদায় হলে মাসে প্রায় ৯০ লাখ টাকার চাঁদা ওঠে।
পুলিশের তথ্যমতে, মিরপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তরিকুল ইসলামের মাধ্যমে এই চাঁদার একটি অংশ থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ গোলাম আজমের কাছেও পৌঁছাত। পরে ১ মে তাঁকে মিরপুর থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গোলাম আজম দাবি করেছিলেন, ফুটপাত থেকে কারা চাঁদা তোলে বা কারা এর ভাগ পায়—এসব বিষয়ে তাঁর কোনো ধারণা নেই।







