বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে আবারও আবেদন করেছেন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম। নিজের পাশাপাশি স্ত্রী ফারজানা পারভীন এবং দুই ছেলে আশরাফুল আলম ও আসাদুল আলম মাহিরের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদনও করেছেন তিনি। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ আবেদন জমা দেওয়া হয়।
তবে চলমান আইনি ও আর্থিক জটিলতার কারণে সরকার আপাতত এস আলম পরিবারের আবেদন অনুমোদনের পক্ষে নয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, নাগরিকত্ব ত্যাগের অনুমতি দেওয়া হলে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা, দেশে থাকা সম্পদ ও সম্পত্তির ওপর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সালিসি মামলায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার প্রাথমিকভাবে দুটি বড় ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েছে। প্রথমত, সাইফুল আলমের বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। নাগরিকত্ব ত্যাগের অনুমতি পেলে সেই অর্থ পুনরুদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়া জটিল হয়ে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, তিনি নিজের সম্পদ রক্ষার দাবিতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে মামলা করেছেন। নাগরিকত্ব নিয়ে তাঁর অবস্থান শক্তিশালী হলে ওই মামলায় বাংলাদেশের অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এর আগে ২০২০ সালেও সাইফুল আলম বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছিলেন। তাঁর আইনজীবীদের দাবি, সে সময় আওয়ামী লীগ সরকার আবেদনটি অনুমোদন করেছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের ২০২০ সালের ১৯ জুলাইয়ের এক স্মারকে বলা হয়, সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব গ্রহণের কারণে তাঁর নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন মঞ্জুর করা হয়েছিল।
তবে ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত বছরের নভেম্বরে ইসলামী ব্যাংক হাইকোর্টে রিট আবেদন করে। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেওয়া সেই স্মারক স্থগিত করেন। ফলে সাইফুল আলমের নাগরিকত্বের বিষয়টি এখনো আইনি নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
এস আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে তিনি ব্যাংক দখল, ঋণ অনিয়ম ও অর্থ পাচারে জড়িয়েছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বিদেশে অবস্থান করছেন এবং আর দেশে ফেরেননি।
২০২৪ সালের নভেম্বরে ব্রিটিশ সংবাদপত্র ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর দাবি করেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে এস আলম গোষ্ঠী বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে।
বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তাঁর সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান করছে এবং ইসলামী ব্যাংকের ঋণ অনিয়ম তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইতিমধ্যে এস আলমসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি অভিযোগপত্র দাখিলের অনুমতি দিয়েছে দুদক।
নাগরিকত্ব–সংক্রান্ত জটিলতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সালিসি মামলাও গুরুত্ব পাচ্ছে। গত অক্টোবরে সাইফুল আলম বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি কেন্দ্রে (ICSID) মামলা করেন। তাঁর অভিযোগ, অবৈধ অর্থ পাচারের অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ সরকার তাঁদের সম্পদ জব্দ, বাজেয়াপ্ত ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বাধা দিয়েছে, যার ফলে শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
মামলাটি ২০০৪ সালে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তির আওতায় করা হয়েছে। আইনি নথিতে এস আলম পরিবার দাবি করেছে, তারা ২০২০ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছে। সেই হিসেবে বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ আন্তর্জাতিক চুক্তির সুরক্ষার আওতায় পড়ে বলে তারা দাবি করছে।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে মামলাটি মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আগামী ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্রে মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। শুনানিকে সামনে রেখে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে এস আলম পরিবারের নাগরিকত্ব, পাসপোর্ট, সম্পদ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম–সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ৩ এপ্রিল দুদক, নির্বাচন কমিশন, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, বিএফআইইউ, পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি), এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের কাছে মতামত চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। সেখানে জানতে চাওয়া হয়েছে, নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন অনুমোদন করা হলে সরকার কী ধরনের জটিলতায় পড়তে পারে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা ঋণ দায় রয়েছে কি না।
ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাইফুল আলম, তাঁর স্ত্রী ফারজানা পারভীন ও ছেলে আসাদুল আলম মাহিরের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হলেও সেগুলো এখনো সক্রিয় রয়েছে। তবে আরেক ছেলে আশরাফুল আলমের পাসপোর্টের তথ্য ডেটাবেজে পাওয়া যায়নি।
এদিকে সাইফুল আলম আসলে কোন দেশের নাগরিক, সেই প্রশ্নও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিনি ২০২০ সালে সাইপ্রাসের নাগরিকত্বের ভিত্তিতে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করেছিলেন। আবার আন্তর্জাতিক সালিসি মামলায় নিজেকে সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে দাবি করেছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব নিতে সাধারণত পূর্বের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হয়। কিন্তু তিনি কবে সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব বাতিল করেছেন এবং কবে সিঙ্গাপুরের নাগরিক হয়েছেন, সে বিষয়ে সরকারের কাছে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই।
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত কোনো নাগরিকের নাগরিকত্ব বহাল থাকে। নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন। তবে চলমান আদালত–সংক্রান্ত জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক সালিসি মামলা বিবেচনায় নিয়ে সরকার এখন এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।







