২০২০ সালে লাহোর মোটরওয়েতে ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্যকর ও নৃশংস গণধর্ষণ মামলার দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড লাহোর হাইকোর্ট বহাল রাখার পর পাকিস্তানের বিচার বিভাগের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্ক। এই ঐতিহাসিক রায়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি পশ্চিমাদেরও এই বিচার ব্যবস্থা অনুসরণের পরামর্শ দেন।
নিম্ন আদালতের দেওয়া সাজা বহাল রেখে উচ্চ আদালত আসামিদের আপিল খারিজ করার পর মাস্ক তাঁর পোস্টে লেখেন, “সাব্বাশ (ব্রাভো) পাকিস্তান! পশ্চিমা বিশ্বে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে আমাদেরও ঠিক এই কাজটিই করা উচিত।” গুরুতর অপরাধ দমনে পশ্চিমা দেশগুলোর কেমন বিচার ব্যবস্থা অনুসরণ করা উচিত, পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্তকে তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লাহোর হাইকোর্টের বিচারপতি সৈয়দ শাহবাজ আলী রিজভী এবং বিচারপতি তারিক মাহমুদ বাজওয়ার সমন্বয়ে গঠিত দুই সদস্যের বেঞ্চ এই রায় দেন। বেঞ্চটি সাজাপ্রাপ্ত আসামি আবিদ মালহি ও শাফকাত বাগার দায়ের করা আপিল খারিজ করে একটি সন্ত্রাসবিরোধী আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের পূর্ববর্তী সাজা বহাল রাখেন।
এই আলোচিত মামলার সূত্রপাত ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে, যখন লাহোর-শিয়ালকোট মোটরওয়েতে সন্তানদের নিয়ে ভ্রমণকালে এক ফরাসি-পাকিস্তানি নারী নির্মম হামলার শিকার হন। মাঝপথে তাঁর গাড়িটি বিকল হয়ে যাওয়ার পর সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা মাঠের মধ্যে টেনে নিয়ে তাঁর ওপর এই নৃশংসতা চালায়। ঘটনাটি পুরো পাকিস্তানজুড়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল এবং দেশটিতে নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে।
লাহোর হাইকোর্ট ধর্ষণের অপরাধে ওই দুই আসামিকে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার পাশাপাশি ডাকাতি, অপহরণ ও অন্যান্য অপরাধের দায়ে নিম্ন আদালতের দেওয়া কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডসহ বাকি সমস্ত সাজাও বহাল রেখেছেন। এর আগে ২০২১ সালের মার্চ মাসে একটি সন্ত্রাসবিরোধী আদালত ধর্ষণের দায়ে ওই দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিল।
আপিল শুনানির সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা যুক্তি দেখান যে, নিম্ন আদালত মামলার প্রকৃত তথ্য-প্রমাণ সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (প্রসিকিউটর) রাহিলা শাহিদ এই আপিলের তীব্র বিরোধিতা করে যুক্তি দেন যে, মূল রায়টি অত্যন্ত শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক তথ্য-প্রমাণ ও আইনি ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। আদালত শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তির সঙ্গে একমত পোষণ করেন।
পাঞ্জাবের প্রসিকিউটর জেনারেল ফরহাদ আলী শাহ বলেন, এই মামলাটি ছিল পাকিস্তানের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। তিনি জানান, মামলাটির তদন্ত প্রক্রিয়া মূলত ভুক্তভোগী নারী কর্তৃক আসামিদের শনাক্তকরণ, অপরাধস্থলের ডিএনএ (DNA) নমুনার সাথে আসামির সংশ্লিষ্টতার শতভাগ প্রমাণ এবং মোবাইল ফোনের কল রেকর্ডের ওপর ভিত্তি করে নিখুঁতভাবে পরিচালিত হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ডাকাতির অপরাধে আদালত উভয় আসামিকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং আড়াই লাখ রুপি করে জরিমানা করেছেন। এছাড়া সন্তানদের অপহরণের দায়ে আসামিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। লাহোর হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বহুল আলোচিত মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির কাছাকাছি পৌঁছালেও, পাকিস্তানের আইনি ব্যবস্থা অনুযায়ী আসামিদের সামনে এখনো সর্বোচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।







