বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ বা ভাড়া প্রত্যাহার নিয়ে দেশজুড়ে এক বড় ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। গত ৩ জুন সরকারি দল বিএনপির ভেরিফাইড ফেসবুক পেজ থেকে প্রচার করা হয় যে, সরকার প্রিপেইড মিটারের মাসিক চার্জ প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কিংবা কোনো বিদ্যুৎ বিতরণ প্রতিষ্ঠানই এই ধরনের কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানে না।
বর্তমানে সারাদেশে প্রায় ৫৫ লাখ গ্রাহকের ঘরে প্রিপেইড মিটার রয়েছে। এর মধ্যে সিঙ্গেল ফেইজ মিটারের মাসিক ভাড়া ৪০ টাকা এবং থ্রি ফেইজ মিটারের ভাড়া ৪২ টাকা। এর বাইরে প্রতি কিলোওয়াটের জন্য আবাসিক গ্রাহককে ৪২ টাকা করে ডিমান্ড চার্জ দিতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, একজন গ্রাহক যদি ৫ কিলোওয়াটের লাইন নেন, তবে প্রতি মাসে ডিমান্ড চার্জ বাবদ ২১০ টাকা এবং সাথে মিটারের ভাড়া যোগ করে বিল পরিশোধ করতে হয়। এই মিটার ভাড়া ও ডিমান্ড চার্জ নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই চরম ক্ষোভ রয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মিটার ভাড়া প্রত্যাহারের কোনো সিদ্ধান্তই বাস্তবে কার্যকর হয়নি। ডিপিডিসির গ্রাহক নাজিমুল ইসলাম এবং পশ্চিম ধানমন্ডির বাসিন্দা আমেনা মুক্তাসহ একাধিক গ্রাহক জানান, তারা পত্রিকায় বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই খবর দেখলেও বাস্তবে রিচার্জ করার সময় নিয়মিতভাবেই মিটার ভাড়া কেটে নেওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিটার ভাড়া বাতিলের বিষয়টি মূলত একটি অপপ্রচার, যার সূত্রপাত হয়েছিল স্বয়ং বিদ্যুৎমন্ত্রীর একটি প্রতিশ্রুতিকে কেন্দ্র করে। গত ২৯ মার্চ বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের পর জানানো হয়েছিল যে মিটার ভাড়া প্রত্যাহার করা হবে। সেই বক্তব্যকে পুঁজি করেই পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হয়।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, প্রিপেইড মিটারের প্রকল্পগুলো মূলত বিভিন্ন সংস্থার ঋণের অর্থে বাস্তবায়িত হয়েছে। গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত মিটার ভাড়া দিয়েই সেই ঋণ পরিশোধ করা হয়। এখন হুট করে সরকার যদি মিটার ভাড়া প্রত্যাহার করতে চায়, তবে ঋণের বিশাল অঙ্কের টাকা কীভাবে পরিশোধ হবে, সেই সমাধান আগে করতে হবে। সারাদেশে ৫৫ লাখ গ্রাহকের কাছ থেকে মিটার ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ২২ কোটি টাকা এবং বছরে ২৬৪ কোটি টাকা আদায় হয়। ফলে ভাড়া তুলতে হলে এই বিপুল পরিমাণ অর্থের দায় সরকারকে নিতে হবে।
এ বিষয়ে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, মিটার ভাড়া তুলে দেওয়ার বিষয়ে কোনো বিতরণ কোম্পানি তাদের কাছে আবেদন করেনি এবং কমিশনও এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৭ সালে সরকারের একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই প্রিপেইড মিটার প্রকল্প ও ভাড়া আদায় চালু হয়। সরকার যদি এই প্রকল্পের ঋণের টাকার দায় নিজের কাঁধে নেয়, তবেই কেবল প্রজ্ঞাপনটি বাতিল করে ভাড়া কাটা বন্ধ করা সম্ভব। এটি সম্পূর্ণ সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।







