জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রশিবিরের ভূমিকা, সমন্বয়কদের সঙ্গে যোগাযোগ, আন্দোলনের নেপথ্যের কৌশল এবং সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। তিনি জানান, কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরুতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন থেকেই তাঁরা নেপথ্যে থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি শাখাকে সাংগঠনিকভাবে সহযোগিতা করার নির্দেশনা দেন। শুরুতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেও কোরবানির ঈদের ছুটির পর শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ফিরলে আন্দোলন নতুন গতি পায়।
প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ না থাকায় ছাত্রশিবির তখন কৌশলগত কারণে ব্যানার নিয়ে সামনে আসেনি। পরিচয় প্রকাশ পেলেই গ্রেপ্তার বা হামলার ঝুঁকি থাকায় তারা নেপথ্যে থেকে কাজ করেছে, যাতে আন্দোলনের সাধারণ শিক্ষার্থীদের চরিত্র অক্ষুণ্ন থাকে এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে এটি প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। তবে ১৬ জুলাইয়ের পর বিভিন্ন ক্যাম্পাসে হামলা ও দমনের প্রেক্ষাপটে শিবিরের কৌশলে পরিবর্তন আসে এবং আন্দোলনকে সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ধরনের সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
১৮ থেকে ২৩ জুলাইয়ের মধ্যে আন্দোলনের শীর্ষ সমন্বয়কদের গ্রেপ্তারের পর দ্বিতীয় সারির নেতাদের নিরাপদ রাখা ও আন্দোলনের গতি সচল রাখাই ছিল প্রধান চ্যালেঞ্জ। ইন্টারনেট বন্ধ থাকার সময়েও শিবিরের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের কর্মীরা অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে হান্নান মাসউদ, আব্দুল কাদেরসহ দ্বিতীয় সারির সমন্বয়কদের ভিডিও বার্তা পেনড্রাইভে সংরক্ষণ করে বিভিন্ন সেফ হাউসে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেছেন। এমনকি আন্তর্জাতিক পরিमंडলে তথ্য প্রেরণের কাজটিও তারা পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করেছে।
সমন্বয়ক কমিটিতে ছাত্রশিবিরের সুপরিচিত কাউকে না রাখার বিষয়টি ছিল একটি সচেতন ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যাতে আন্দোলনকে শিবিরের আন্দোলন বলে অপপ্রচার করার সুযোগ না পায় এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট না হয়, সেজন্যই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। আন্দোলনের লজিস্টিক সহায়তার অংশ হিসেবে আহতদের হাসপাতালে নেওয়া, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, গ্রেপ্তারকৃতদের আইনি সহায়তা দেওয়া এবং নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজগুলো শিবিরের মেডিকেল নেটওয়ার্ক ও স্থানীয় সাংগঠনিক কাঠামো অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে করেছে।
আন্দোলনের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের জন্য গোপনে ‘হোপ’ (Hope) নামে একটি ছয় সদস্যের কমিটি এবং টেলিগ্রাম গ্রুপ গঠন করা হয়েছিল। ৭ বা ৮ জুলাই থেকে চালু হওয়া এই গ্রুপটি এতটাই গোপন ছিল যে কেন্দ্রীয় সেক্রেটারিয়েটের অধিকাংশ সদস্যও এর অস্তিত্ব জানতেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা সাদিক কায়েম ও এস এম ফরহাদের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে প্রতিদিন সন্ধ্যায় ‘হোপ’ গ্রুপে পরবর্তী দিনের কর্মসূচির রণকৌশল নির্ধারণ করা হতো। আন্দোলনের একপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘নয় দফা’ কর্মসূচির খসড়া প্রণয়নেও ছাত্রশিবিরের দায়িত্বশীলদের ভূমিকা ছিল।
১ আগস্ট জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার পর তারা অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নেন। জরুরি বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে নিষিদ্ধের প্রতিবাদে আলাদা কোনো মিছিল, সমাবেশ বা বিবৃতি দেওয়া হবে না, কারণ তাতে সরকার পুরো আন্দোলনকে জামায়াত-শিবিরের আন্দোলন হিসেবে প্রচারের সুযোগ পেয়ে যেত। এরপর পরিস্থিতি ‘ডু অর ডাই’ পর্যায়ে চলে গেলে ঢাকাকে কয়েকটি অপারেশনাল জোনে ভাগ করে কেন্দ্রীয় নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং ৫ আগস্টের ‘চলো চলো ঢাকা চলো’ কর্মসূচি একদিন এগিয়ে আনার ক্ষেত্রেও তারা সমন্বয়কদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন।
৫ আগস্টের প্রস্তুতির বিষয়ে শিবিরের সভাপতি জানান, পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হতে পারে ধরে নিয়ে সবাইকে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছিল। বিশেষ করে, ৫ আগস্টের আগে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে দায়িত্ব ভাগ করার সময় পরিবার থেকে শেষ বিদায় নিয়ে আসতে বলা হয়েছিল শিবিরের নেতাদের। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী অনেকেই পরিবার-পরিজনের সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করে বের হয়েছিলেন। অনেকেই ওজু করে এবং নফল নামাজ পড়ে মাঠে নামেন, কারণ সবার মানসিকতা ছিল—যা-ই ঘটুক, এবার আর পেছনে ফেরার সুযোগ নেই।
৫ আগস্ট সকালে পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকলেও দুপুরের দিকে যখন হাজার হাজার মানুষ গণভবনের অভিমুখে রওনা হয়, তখন বিজয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পুরো আন্দোলনজুড়ে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের নির্দেশনা ছিল মাঠের পরিস্থিতি বিবেচনায় দায়িত্বশীলরা প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবেন। জুলাই আন্দোলনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা স্মরণ করে শিবিরের সভাপতি বলেন, উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে একাধিক হতাহতের ঘটনা এবং শহীদ শাকিল পারভেজের জানাজা আয়োজনের সংকটের কথা আজও তাঁকে নাড়া দেয়। নিহতদের একটি নিজস্ব তথ্যভাণ্ডার থাকলেও তারা দলভিত্তিক শহীদের তালিকা প্রকাশের পক্ষে নন।
জুলাই পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে তিনি বলেন, এই পরিবর্তনের সুফল বিএনপি, জামায়াতসহ সব দলই পেয়েছে। তবে আন্দোলনের সময় ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে যে ঐক্য ছিল, তা পরবর্তীতে ধরে রাখা যায়নি এবং বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ঘটা সংঘাতের দায় অনেকাংশে ছাত্রদলের কর্মকাণ্ডের ওপর বর্তায়। সর্বোপরি, রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কারের যে প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ আন্দোলনে নেমেছিল, তার বাস্তব অগ্রগতি এখনও আশানুরূপ না হওয়াটাই জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা বলে তিনি মনে করেন।






