সমুদ্রের তলদেশে নতুন ভূত্বক (Oceanic Crust) তৈরি হওয়ার বিরল প্রক্রিয়া এবার প্রথমবারের মতো সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার ফলে কীভাবে নতুন সমুদ্রতল গড়ে ওঠে, সে বিষয়ে দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক ধারণাকে এবার বাস্তব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আরও শক্তিশালী প্রমাণ মিলেছে।
সাধারণত পৃথিবীর এক অংশে পুরোনো সমুদ্রভূত্বক টেকটোনিক প্লেটের নিচে তলিয়ে যায়, আর অন্য অংশে দুটি প্লেট পরস্পর থেকে দূরে সরে গেলে পৃথিবীর গভীর থেকে গলিত ম্যাগমা ওপরে উঠে এসে নতুন সমুদ্রতল তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরগতির হওয়ায় সরাসরি দেখা প্রায় অসম্ভব।
তবে ২০২৪ সালে ভারত মহাসাগরের একটি মধ্য-মহাসাগরীয় পর্বতশ্রেণিতে ধারাবাহিক ভূমিকম্পের সময় গবেষকেরা এই বিরল ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেন। তাদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তিন ফুটেরও বেশি নতুন সমুদ্রতল সৃষ্টি হয়েছে এবং পর্বতশ্রেণির একটি অংশ প্রায় ১৩ ফুট নিচে ধসে পড়ে।
গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার প্রধান লেখক, সামুদ্রিক ভূ-পদার্থবিদ জিন ইভস রয়ার জানান, ঘটনাস্থলে আগেভাগে যন্ত্রপাতি স্থাপন করা ছিল তাদের জন্য অসাধারণ সৌভাগ্যের বিষয়। লাভা তাদের যন্ত্রপাতি থেকে মাত্র এক থেকে দুই কিলোমিটার দূরে উঠে আসায় কোনো তথ্য নষ্ট হয়নি।
গবেষকেরা ‘ওএইচএ-জিওড্যামস’ নামে একটি সমুদ্রতল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা স্থাপন করেছিলেন, যেখানে ১৫টি মনিটরিং স্টেশন ছিল। এসব স্টেশন ভূমিকম্প, পাথরের নড়াচড়া এবং অন্যান্য ভূ-প্রাকৃতিক পরিবর্তনের শব্দতরঙ্গ রেকর্ড করছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ভূমিকম্প শুরু হওয়ার মাত্র দুই মাস আগেই যন্ত্রপাতিগুলো সেখানে বসানো হয়েছিল।
পানির নিচের মাইক্রোফোন, প্রেসার সেন্সর এবং উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন যে, পৃথিবীর গভীরে থাকা উচ্চচাপের ম্যাগমা ভূত্বকের ফাটল দিয়ে ওপরে উঠে আসে। এর ফলে টেকটোনিক প্লেটগুলো আরও দূরে সরে যায় এবং ম্যাগমা ঠান্ডা হয়ে জমাট বেঁধে নতুন সমুদ্রতল গঠন করে।
গবেষণায় অংশ না নেওয়া সামুদ্রিক ভূবিজ্ঞানী অ্যারন মিকালিফ বলেন, এ ধরনের সরাসরি পরিমাপ অত্যন্ত বিরল এবং সমুদ্রতলের পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। একইভাবে জিওমার হেলমহোল্টজ সেন্টার ফর ওশান রিসার্চ–এর গবেষক ইঙ্গো গ্রেভমেয়ারও ঘটনাটিকে ‘লটারি জেতার মতো সৌভাগ্য’ বলে মন্তব্য করেছেন।
সমুদ্রের গভীরে এমন গবেষণা পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল। গবেষকদের ৪৫ দিনের সমুদ্রযাত্রার মাধ্যমে সেন্সর স্থাপন করতে হয়েছে এবং তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রতিবছর সেখানে ফিরে যেতে হচ্ছে। উডস হোল ওশেনোগ্রাফিক ইনস্টিটিউশন–এর সামুদ্রিক ভূতাত্ত্বিক ড্যানিয়েল ফোরনারি বলেন, সমুদ্রতলে গবেষণা পরিচালনায় বিশেষ প্রকৌশল দক্ষতা ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।
বর্তমানে পর্যবেক্ষণ যন্ত্রগুলো আবার সমুদ্রের তলদেশে স্থাপন করা হয়েছে এবং ২০২৭ সাল পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করবে। গবেষকদের আশা, এই পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যতে সমুদ্রতলের পরিবর্তন, ভূমিকম্প এবং পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ ভূ-প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ঘাটনে সহায়ক হবে।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস







