কুয়েতে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের প্রাণঘাতী ড্রোন হামলার পর মার্কিন সেনা নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। হামলায় বেঁচে যাওয়া একাধিক সেনাসদস্যের অভিযোগ, হামলার মুহূর্তে দুই শীর্ষ জেনারেল নিরাপদ বাঙ্কারে আশ্রয় নিলেও আগুনে আটকে পড়া সৈন্যদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেননি। এ ঘটনাকে ঘিরে চলমান সামরিক তদন্তে উঠে আসছে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য।
ওয়াশিংটন পোস্ট–এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ মার্চ কুয়েতের পোর্ট শুয়াইবা ঘাঁটির অপারেশন সেন্টারে একটি ইরানি শাহেদ ড্রোন সরাসরি আঘাত হানে। প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ভবনের মাঝখান ধসে পড়ে, চারদিকে আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং কম্পিউটার, কাচ ও ধাতব টুকরো ছিটকে সৈন্যদের ওপর আঘাত হানে। এতে ১০৩তম সাসটেইনমেন্ট কমান্ডের ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হন এবং ৩০ জনের বেশি আহত হন।
প্রত্যক্ষদর্শী সেনাদের ভাষ্য, বিস্ফোরণের কয়েক সেকেন্ড পর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ক্লিন্ট বার্নস জরুরি নির্গমন পথ দিয়ে একটি নিরাপদ বাঙ্কারের দিকে ছুটে যান। এ সময় বহু সৈন্য ভবনের ভেতরেই আটকে ছিলেন। আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যেও কয়েকজন কর্মকর্তা ও সাধারণ সেনাসদস্য জীবিতদের উদ্ধারে ভবনের ভেতরে ফিরে যান। তবে তাদের দাবি, জেনারেল বার্নস বা মেজর জেনারেল জন হিনসনকে উদ্ধার অভিযানে দেখা যায়নি।
হামলায় বেঁচে যাওয়া এক সৈনিক বলেন, “আমি শুধু দাঁড়িয়ে থেকে এটা ঘটতে দেখতে পারিনি।” তিনি জানান, অন্য এক কর্মকর্তার অনুরোধে তিনি আবার জ্বলন্ত ভবনে ঢুকে জীবিতদের খুঁজতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁর দাবি, জেনারেলরা সেই ঝুঁকি নেননি। এই ট্র্যাজেডি এড়ানো যেত উল্লেখ করে সৈন্যদের অভিযোগ, হামলার আগেই গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক সতর্কবার্তায় পোর্ট শুয়াইবাকে ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
বাহিনীর নিজস্ব নিরাপত্তা মূল্যায়নেও পর্যাপ্ত ড্রোন প্রতিরক্ষা না থাকায় সেখানে সেনা মোতায়েন না করার সুপারিশ ছিল। তবুও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ক্লিন্ট বার্নস ও মেজর জেনারেল জন হিনসনের সিদ্ধান্তে সেখানে সেনাদের পাঠানো হয়। আরও অভিযোগ রয়েছে, ঘাঁটির জন্য অতিরিক্ত ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চাওয়া হলেও তা অনুমোদন করা হয়নি। এমনকি হামলার আগে এলাকায় সন্দেহজনক ড্রোন উড়তে দেখার ঘটনাও জানানো হয়েছিল বলে দাবি করেন কয়েকজন সেনাসদস্য।
হামলার পর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আহত সেনাদের অভিযোগ, কুয়েত থেকে জার্মানিতে নেওয়ার পরও অনেককে গুরুতর আহত হিসেবে নিবন্ধন করা হয়নি। ফলে তাঁরা সময়মতো বিশেষায়িত চিকিৎসা পাননি। বেঁচে যাওয়া সেনাদের অনেকেই ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেছেন, এই হামলা তাঁদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ, অপরাধবোধ ও বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতি তৈরি করেছে। তাঁদের ভাষ্য, নেতৃত্ব যদি গোয়েন্দা সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দিত এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করত, তাহলে হয়তো ছয় সহযোদ্ধার প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হতো।
তবে মার্কিন আর্মি সেন্ট্রাল এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার না করলেও জানিয়েছে, পোর্ট শুয়াইবা অপারেশনাল পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্বাচন করা হয়েছিল এবং সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও বাঙ্কারের ব্যবস্থা ছিল। বাহিনীর দাবি, হামলার পর নেতৃত্ব উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিল এবং গোয়েন্দা তথ্য ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে পৃথক তদন্ত চলছে।
তদন্ত সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তাদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তা বা জেনারেলের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়নি। তবে হামলায় বেঁচে যাওয়া সেনারা মনে করছেন, প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।







