ইরানের সঙ্গে চলমান প্রায় পাঁচ মাসের যুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বিশ্বাসে অটল রয়েছেন। তাঁর ধারণা, মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানকে যথেষ্ট শক্ত আঘাত করলে দেশটির নেতারা শেষ পর্যন্ত তাঁর শর্তে আলোচনায় বসতে বাধ্য হবেন। তবে ট্রাম্পের এই রণকৌশল মার্কিন সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং ইরাক-আফগানিস্তানের মতো অতীতের যুদ্ধগুলোর অমীমাংসিত ইতিহাসকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান আলোচনায় না বসলে তাদের সব বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
নব্বইয়ের দশকের পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধের পর নিখুঁত ও বহুমুখী হামলা দিয়ে শত্রুকে দ্রুত পরাস্ত করার যে মার্কিন রণকৌশল তৈরি হয়েছিল, তা ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়। বর্তমানে আমেরিকার এই বিশাল সামরিক শক্তির সঠিক ব্যবহার নিয়ে হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের মধ্যে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক নীতি অনুযায়ী—ভুলভাবে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করলে শুধু শত্রুর সংখ্যাই বাড়ে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ৩৮ দিনের প্রাথমিক সামরিক অভিযানে তেহরানের একটি কম্পাউন্ডে ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি এবং শীর্ষ সামরিক কমান্ডাররা নিহত হন। পেন্টাগনের দাবি, তারা প্রায় ১৩ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনে ইরানের বিমান ও নৌবাহিনী ধ্বংস করেছে। গত ৮ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও চুক্তি স্বাক্ষরে ব্যর্থ হয়ে চলতি মাসে তা ভেঙে যায় এবং পুনরায় যুদ্ধ শুরু হয়।
দুই শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তার মতে, ব্যাপক হামলার পরও ইরান ইতোমধ্যে তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং ভূগর্ভস্থ সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করে ফেলেছে। চলতি মাসে মার্কিন যুদ্ধবিমান যেসব লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে, তার বেশিরভাগই গত ফেব্রুয়ারিতেও আক্রান্ত হয়েছিল। ফলে মাঝেমধ্যে হামলা থামানো বা দ্রুত বিজয়ের ঘোষণা দেওয়ায় ইরান সামলে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে বলে মনে করছেন সামরিক বিশেষজ্ঞরা।
প্রণালির কাছাকাছি সামরিক লক্ষ্যবস্তু কমে আসায় ট্রাম্প এখন ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎ গ্রিডের মতো বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিচ্ছেন। তবে এই ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ‘যুদ্ধাপরাধের’ শামিল কি না, তা নিয়ে পেন্টাগনের ভেতরেই বড় ধরনের আইনি শঙ্কা ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ফোর্স লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস. ক্লিনটন হিনোটের মতে, নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করার অভিযান সব সময় কাঙ্ক্ষিত ফল আনে না। শীর্ষ নেতারা নিহত হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন এখন এমন এক ক্ষুব্ধ ও অনমনীয় ইরানি নেতৃত্বের মুখোমুখি, যারা কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, ২০০১ সালে তালেবান এবং ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের বাহিনীকে ধ্বংস করেও মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সেই সামরিক সাফল্যকে দীর্ঘমেয়াদি বিজয়ে রূপান্তর করতে পারেননি; ইরানের ক্ষেত্রেও সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।







