বাজারে আকর্ষণীয় টসটসে হলুদ রঙের আনারস দেখলেই সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দ্রুত মুনাফার আশায় অনেক ক্ষেত্রে গাছে থাকা অবস্থায় কিংবা সংগ্রহের পর ইথোফন, ক্যালসিয়াম কার্বাইডসহ বিভিন্ন রাসায়নিক ও হরমোন ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে আনারস পাকানো হচ্ছে। কৃষক থেকে পাইকারি ও খুচরা বাজার হয়ে এসব আনারস পৌঁছে যাচ্ছে সাধারণ ভোক্তার হাতে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন এসব রাসায়নিকযুক্ত ফল খেলে কিডনি ও লিভারের ক্ষতি, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা এবং ক্যানসারের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা পুষ্টির জন্য নিয়মিত আনারস খাওয়ায় তাদের ঝুঁকিও বেশি।
রাঙামাটির আনারসচাষি সায়মং জানান, গাছে প্রাকৃতিকভাবে পাকা আনারস সাধারণত পুরোপুরি হলুদ হয় না; এতে কিছুটা সবুজাভ রং থাকে। কিন্তু বাজারে ক্রেতারা বেশি হলুদ আনারস পছন্দ করায় অনেকেই রাসায়নিক ও হরমোন ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে রং ও আকার বাড়িয়ে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে রাসায়নিক প্রয়োগের পরপরই আনারস সংগ্রহ করে বাজারজাত করা হয়, যা ভোক্তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ), বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই), জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারাও খাদ্যে ভেজালের মাত্রা উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন। তাদের মতে, শুধু ফল নয়, মাছ, মাংস, মসলা, দুধ, জুস ও ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানোর প্রবণতা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ বলেন, ভেজাল ও রাসায়নিকযুক্ত খাবার এখন নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। এসব খাবার শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করার পাশাপাশি হজমের সমস্যা, ডায়রিয়া, কিডনি ও লিভারের ক্ষতি এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
রাজধানীর নয়াবাজারে আনারস কিনতে আসা মো. শাহ আলম জানান, তার চার বছরের মেয়ের জ্বর হওয়ায় আনারস কিনতে এসেছেন। তবে বাজারের প্রায় সব আনারসই অস্বাভাবিকভাবে হলুদ। বিক্রেতারা গাছপাকা দাবি করলেও তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, আনারসে মাছি বসে না এবং মাথা ভাঙলেও স্বাভাবিক গন্ধ পাওয়া যায় না, যা তাকে শঙ্কিত করছে।
ইবনেসিনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডায়েটিশিয়ান সিরাজাম মুনিরা বলেন, রোগীর পুষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় খাবারেও এখন ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পাওয়া যাচ্ছে। এতে শিশুদের অ্যালার্জি, সংক্রমণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে কিডনি, লিভার ও ক্যানসারসহ গুরুতর রোগের আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, দেশে নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩, ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৫ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯সহ বিভিন্ন আইন থাকলেও সেগুলোর কার্যকর প্রয়োগের ঘাটতি রয়েছে। তিনি বাজার তদারকি জোরদার, সংশ্লিষ্ট সংস্থার জনবল বৃদ্ধি এবং অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি জানান।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি) ড. মোহাম্মদ মোস্তফা জানান, নিয়মিত বাজার থেকে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়। কোনো পণ্যে ভেজাল পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বিক্রেতা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে পুনরায় নমুনা পরীক্ষা করে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হয়।







