পতিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতি পুনর্বাসনের লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ শিক্ষক গোপনে তৎপরতা চালাচ্ছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে শিক্ষাঙ্গন ও সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়টি তদন্তে ইতোমধ্যে অন্তত পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি গঠন করেছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক সংগঠন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দেশের ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৪০৪ শিক্ষক ‘বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ নামে একটি এনক্রিপ্টেড টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে গোপনে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। ওই গ্রুপে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরির বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া সাবেক উপাচার্য ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে থাকা কয়েকজন শিক্ষক ‘সিস্টেম আপডেট’ ও ‘মাহেন্দ্রক্ষণ সন্নিকটে’র মতো সংকেত ব্যবহার করে নিয়মিত ভার্চুয়াল বৈঠক করছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমের স্ক্রিনশট ও তথ্য পুলিশ সদর দপ্তরে পৌঁছেছে বলেও সূত্রের বরাতে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সম্প্রতি জানিয়েছেন, দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মতিঝিল ও আশুলিয়ায় বোমা উদ্ধারের ঘটনাসহ সাম্প্রতিক কিছু বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বক্তব্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেছেন, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ শিক্ষক শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে চাইছেন—এমন তথ্য তারা পেয়েছেন এবং বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রতিহিংসার বিষয় নয়; অন্যায় হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি বলেন, কেউ রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে আইনের আওতায় তার বিচার হওয়া উচিত। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, আগের সরকারের সময়ে আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের কারণে ভিন্নমতের শিক্ষকরা নানা ধরনের চাপ ও নির্যাতনের মুখে পড়েছিলেন।
শিক্ষক নেতাদের প্রতিক্রিয়া
জুলাই আন্দোলনপন্থি শিক্ষক সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংকের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন বলেন, কোনো অভিযুক্ত বা দণ্ডিত ব্যক্তিকে দেশে ফিরিয়ে আনা শিক্ষকদের দায়িত্ব নয়। শিক্ষক সমাজের দায়িত্ব জ্ঞানচর্চা এবং ন্যায় ও সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
তার মতে, কোনো শিক্ষক সত্যিই এ ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। তবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে হয়রানি করা থেকে বিরত থাকারও আহ্বান জানান তিনি।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন ‘গ্রিন ফোরাম’ও এ অভিযোগের নিন্দা জানিয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. ওবায়দুল ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের নামও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্ত কমিটি
অভিযোগ তদন্তে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়:
৬৮ শিক্ষকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী গোপন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ তদন্তে চার সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক নাছির আহমাদকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটিকে আগামী ১৩ আগস্টের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়:
৪২ শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ও তাদের পরিচয় যাচাইয়ে পাঁচ সদস্যের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম-২-এর নেতৃত্বে কমিটিকে দ্রুত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়:
৪৪ শিক্ষকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী গোপন কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপ-উপাচার্য অধ্যাপক এমতাজ হোসেনকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটিকে ১২ আগস্টের মধ্যে প্রতিবেদন ও সুপারিশ জমা দিতে বলা হয়েছে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়:
শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার গোপন তৎপরতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তানজিউল ইসলাম জীবনকে আহ্বায়ক করা হয়েছে।
হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়:
গণমাধ্যমে কয়েকজন শিক্ষকের নাম আসার পর তাদের পরিচয়, কার্যক্রম ও দায় যাচাইয়ে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
এদিকে ইউনিভার্সিটি টিচার্স ফোরামের প্রধান সংগঠক মো. কবীর উদ্দিন অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের কোনো শিক্ষক বা গোষ্ঠী যদি শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকে, তাহলে তা গণঅভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থী। তিনি এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।







